অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার উইল পুকোভস্কির দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বারবার মাথায় আঘাত বা কনকাশন। খেলতে গিয়ে মোট ১৩ বার কনকাশনের শিকার হওয়া এই ক্রিকেটারের সঙ্গে অবশেষে সমঝোতায় পৌঁছেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) ও ভিক্টোরিয়া ক্রিকেট। এর ফলে পুকোভস্কিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে সমঝোতার আর্থিক অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি। ফক্স স্পোর্টসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুকোভস্কির ক্যারিয়ার শেষ করে দেওয়া ১৩টি কনকাশনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া, ক্রিকেট ভিক্টোরিয়া ও পুকোভস্কির মধ্যে গোপন আর্থিক চুক্তি হয়েছে।
২৮ বছর বয়সী পুকোভস্কি এখনো মাথায় আঘাতজনিত বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন। তার মধ্যে রয়েছে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, মাথাব্যথা, বমিভাব এবং শরীরের বাঁ পাশ দিয়ে বিভিন্ন কাজ করতে অসুবিধা। ভবিষ্যতে ক্রনিক ট্রমাটিক এনসেফালোপ্যাথি (CTE)-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্কের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
পুকোভস্কির মাথায় আঘাতের ইতিহাস অবশ্য পেশাদার ক্রিকেটে প্রবেশের আগেই শুরু হয়েছিল। ২০১৪ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্কুলে অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবলের অনুশীলনের সময় গুরুতর মাথায় আঘাত পান তিনি। তার অভিযোগ, জ্ঞান ফেরার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে আবার অনুশীলনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ওই আঘাতের পর তার শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছিল যে কয়েক মাস স্কুলে যেতে পারেননি তিনি। হাসপাতালে চিকিৎসাও নিতে হয়েছিল তাকে।
নিজের সেই অভিজ্ঞতা স্মরণ করে পুকোভস্কি বলেছিলেন, ওই দিনটি তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সেই ঘটনার পর থেকে তিনি আর আগের মতো অনুভব করেননি।
পুকোভস্কির ক্রিকেট ক্যারিয়ার ছিল সম্ভাবনাময়। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে উঠে এসে দ্রুতই অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট মহলে নজর কাড়েন তিনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে জাতীয় দলে জায়গা করে নেন।
২০২১ সালে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয় পুকোভস্কির। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট অভিষেকের আগে তার ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্স তাকে জাতীয় দলের দরজা খুলে দেয়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার পথও সহজ ছিল না। বারবার মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণে দল থেকে ছিটকে যেতে হয়েছে তাকে।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পুকোভস্কির পরিসংখ্যানও ছিল বেশ ভালো। ৩৬টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তার ব্যাটিং গড় ৪৫.১৯ এবং সেঞ্চুরি ৭টি। এই পরিসংখ্যানই দেখায়, সুস্থ অবস্থায় তিনি অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন।
কিন্তু একের পর এক কনকাশন তার ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দেয়। প্রতিবার মাঠে ফেরার পর আবারও মাথায় আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের পরামর্শে ২০২৪ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে পেশাদার ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ও ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে সমঝোতার পাশাপাশি নিজের সাবেক স্কুল ব্রাইটন গ্রামারের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন পুকোভস্কি। স্কুলজীবনে পাওয়া প্রথম গুরুতর মাথার আঘাত এবং এরপর তাকে যেভাবে অনুশীলনে ফেরানো হয়েছিল, সেই বিষয়টি তার আইনি পদক্ষেপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পুকোভস্কির ঘটনা ক্রিকেটে কনকাশন ব্যবস্থাপনা এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে মাথায় আঘাত পাওয়ার পর একজন খেলোয়াড়কে কখন মাঠে ফেরানো নিরাপদ, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্রীড়া সংগঠনগুলো গত কয়েক বছরে আরও সতর্ক হয়েছে।
পুকোভস্কির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—তার ক্রিকেটীয় প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও বারবার মাথায় আঘাত শেষ পর্যন্ত তাকে ক্যারিয়ার থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করেছে। ক্ষতিপূরণের এই সমঝোতা তার দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যার আর্থিক দিকটি কিছুটা সামলাতে সহায়তা করতে পারে।




























