বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের জন্য এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বটা শেষ হলো হতাশার এক গল্প হয়ে। ভারতের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে অন্তত একটা ভালো ফল নিয়ে মাঠ ছাড়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেটিও কাজে লাগাতে পারল না লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। দোস্তলিক স্টেডিয়ামে ভারত ৩-০ গোলে হারিয়েছে বাংলাদেশকে। অথচ মাত্র কয়েক মাস আগেই মালদ্বীপে ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জিতে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। সেই সাফল্যের স্মৃতি সঙ্গে নিয়েই এবার এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে নেমেছিল দলটি। কিন্তু মাঠের গল্প হলো পুরো উল্টো। প্রথম দুই ম্যাচে উজবেকিস্তান ও সিরিয়ার কাছে হারের পর ভারতের বিপক্ষেও বড় ব্যবধানে হারল বাংলাদেশ।
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য ছিল অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতার। প্রথম দুই ম্যাচ হেরে আগেই চূড়ান্ত পর্বে ওঠার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবু প্রতিবেশী ভারতের বিপক্ষে ভালো পারফরম্যান্স দিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করার প্রত্যাশা ছিল। ভারপ্রাপ্ত কোচ আতিকুর রহমানও ম্যাচের আগে ইতিবাচক থাকার কথা বলেছিলেন। কিন্তু মাঠে নামার পর সেই আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায়নি। বাংলাদেশের রক্ষণভাগ বারবার জায়গা ছেড়ে দিয়েছে, আক্রমণভাগও তৈরি করতে পারেনি তেমন পরিষ্কার সুযোগ। ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে চলে যায় ভারতের হাতে। এর আগে দলের পারফরম্যান্স ও মাঠের বাইরের নানা বিষয় নিয়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।
২৬ মিনিটেই বাংলাদেশকে প্রথমবার কাঁপিয়ে দেন ভারতের ড্যানি মেইতেই লাইশরাম। বক্সে আসা বল ঠিকমতো ক্লিয়ার করতে পারেনি বাংলাদেশের রক্ষণ। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে বল জালে পাঠান ভারতের তরুণ মিডফিল্ডার। গোলকিপার রাজ চৌধুরী চেষ্টা করেও বলটি আটকাতে পারেননি। গোল খাওয়ার পর বাংলাদেশ কিছুটা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করলেও ভারতের রক্ষণ ভাঙার মতো ধারাবাহিক চাপ তৈরি করতে পারেনি। বরং বাংলাদেশের মাঝমাঠ ও রক্ষণে সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতও বুঝে যায়, একটু ধৈর্য ধরে খেললেই আরও সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের সমস্যা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। ম্যাচের ৬০ মিনিটে থ্রো-ইন থেকে পাওয়া বলে বাংলাদেশের বক্সে দারুণ এক ব্যাকভলি করে ব্যবধান ২-০ করেন বিশাল যাদব। এই গোলটিও বাংলাদেশের রক্ষণভাগের দুর্বলতার চিত্র সামনে আনে। ভারতীয় খেলোয়াড়দের যথেষ্ট জায়গা দিয়ে ফেলেছিল বাংলাদেশের ডিফেন্স। গোল হজমের পর কিছুটা উত্তেজনাও ছড়ায় মাঠে। একটি ফাউল নিয়ে বাংলাদেশের ডিফেন্ডার মিঠু চৌধুরীর সঙ্গে রেফারির কথা-কাটাকাটি হয়। পরে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও সাময়িক উত্তেজনা দেখা যায়। তবে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে। বাংলাদেশ এরপর গোল শোধের চেষ্টা করলেও আক্রমণভাগের তৎপরতা ছিল অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।
স্ট্রাইকার মাহী খান ও উহঙ্গার অ্যাডাম আব্বাস কয়েকবার সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁদের কাছে নিয়মিত বল পৌঁছায়নি। ফলে ভারতের গোলমুখে বড় কোনো হুমকি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ম্যাচের শেষ দিকে বাংলাদেশের রক্ষণ আবারও ভুল করে বসে। সেই সুযোগে বক্সের ভেতর থেকে বল জালে পাঠান ভারতের বদলি মিডফিল্ডার মো. আরবাশ। তাতেই ম্যাচের ফল কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায়। ৩-০ গোলের হার শুধু শেষ ম্যাচের পরাজয় নয়, পুরো বাছাইপর্বে বাংলাদেশের দুর্বলতারও যেন প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়। তিন ম্যাচে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে আক্রমণের চেয়ে রক্ষণভাগের ভুলই বেশি আলোচনায় এসেছে।
উজবেকিস্তানের কাছে ২-০, সিরিয়ার কাছে ৩-০ এবং ভারতের কাছে ৩-০—টানা তিন হারে শেষ হলো বাংলাদেশের এশিয়ান কাপ বাছাই অভিযান। অন্যদিকে সিরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে শুরু করা ভারতও উজবেকিস্তানের কাছে ৪-০ গোলে হেরেছিল। শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে জয় তাদের চূড়ান্ত পর্বে ওঠার লড়াইয়ে টিকিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশের জন্য এখন সামনে বড় প্রশ্ন—সাফের সাফল্যের পর এত দ্রুত এমন পতন কেন? দল নির্বাচন, প্রস্তুতি, কোচিং কাঠামো কিংবা মাঠের কৌশল—কোথায় ঘাটতি ছিল, সেটি খুঁজে বের করাই হবে পরবর্তী কাজ। কারণ বয়সভিত্তিক ফুটবলে একটি টুর্নামেন্টের ফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভুলগুলো চিহ্নিত করে পরের প্রজন্মকে আরও শক্তিশালী করে তোলা।




























