সার সংকটকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। আমন মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কৃষকরা বিক্ষোভ করেছেন, কোথাও মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। আবার কুড়িগ্রামের রৌমারীতে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে ডিলারের গুদামের সাটার ও টিনের বেড়া ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সময়ে অবৈধভাবে সার মজুতের অভিযোগে মাগুরায় দুই ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে সার সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয় একটি ডিলারের গুদামের সামনে রোববার মধ্যরাত থেকেই কৃষকরা সার কেনার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সকালে ডিলারের পক্ষ থেকে পুলিশ এনে সার বিতরণের কথা বলা হলেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও সার না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে গুদামের সাটার ও টিনের বেড়া ভেঙে প্রায় ১৫০ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ডিলার মতিউর রহমানও দাবি করেছেন, ধৈর্য হারিয়ে কৃষকরা গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ সার নিয়ে গেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় পুলিশ ও বিজিবির টহল জোরদার করা হয়।
রাজশাহীর পুঠিয়াতেও সার নিয়ে কৃষকদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে এসেছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খুচরা বাজারে কথিত সার সিন্ডিকেট বন্ধের দাবিতে বানেশ্বর বাজার এলাকায় বিক্ষোভ করেন কৃষকরা। পরে তারা ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করলে যান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। কৃষকদের অভিযোগ, আমন মৌসুমে জমিতে সার দেওয়ার উপযুক্ত সময় চললেও ডিলারদের কাছে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের আরও অভিযোগ, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। সার সিন্ডিকেট বন্ধ ও নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবিতে কৃষকরা রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কের ফকিরের তকেয়া এলাকায় অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকার পর উপজেলা প্রশাসনের আশ্বাসে তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। অন্যদিকে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে খোলা বাজারে সার বিক্রির দাবিতে কৃষকরা বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বারকে অবরুদ্ধ করে রাখেন তারা। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। সেখানে কৃষকদের মধ্যে ৩৩৫ বস্তা ডিএপি, ৯৫ বস্তা টিএসপি এবং ১৫৭ বস্তা এমওপি সার বিতরণের তথ্য পাওয়া গেছে।
মাগুরার শ্রীপুরে সার মজুত নিয়ে প্রশাসনের অভিযান পরিস্থিতির আরেকটি দিক সামনে এনেছে। অবৈধভাবে সার মজুতের অভিযোগে করা মামলায় ব্যবসায়ী শহিদ জোয়ার্দার ও নবাব জোয়ার্দারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর আগে তাদের বাড়ি ও গুদামে অভিযান চালিয়ে ৩২৮ বস্তা সার জব্দ করা হয়। প্রশাসনের এ অভিযান বাজারে সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সময়ে শেরপুরের নালিতাবাড়ীতেও সার না পাওয়ার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম কিবরিয়ার একটি ফেসবুক পোস্টের পর প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ বিষয়টি নিয়ে মাঠে নামে। তবে স্থানীয় এক ডিলার এ অভিযোগকে গুজব হিসেবে দাবি করেছেন।
সব মিলিয়ে সার সংকট এখন শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত দুর্ভোগের বিষয় নয়; এটি স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাপনা, ডিলার পর্যায়ের সরবরাহ এবং কৃষকদের সময়মতো উৎপাদন উপকরণ পাওয়ার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। আমন মৌসুমে সঠিক সময়ে সার প্রয়োগ করতে না পারলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি ফলন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তাই কৃষকদের দাবি অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার সরবরাহ, বাজারে নজরদারি বৃদ্ধি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন কৃষকরা।


























