ভাঁজ করা যায় এমন ফোন বাজারে বেশ কিছুকাল ধরেই আছে। তবে আইফোন প্রথমবারের মতো এমন ফোন এনেছে। এই ফোনে ব্যবহার করা হয়েছে এমন কাচ, যেটা মানুষের চুলের চেয়েও পাতলা। এত পাতলা কাচ বারবার ভাঁজ করার পরও ভাঙে না কেন, সে বিষয়ে অনেকেই কৌতূহলী।
অ্যাপলের নতুন এই স্মার্টফোনের নাম আইফোন ডুও। ফোনটিতে আছে ৭.৬ ইঞ্চি কাচের পর্দা। অসংখ্যবার ভাঁজ করা যাবে এটি। ভাঁজ করলেও ভাঙবে না। এর আগে এমন ফোন বাজারে এনেছে গুগল, স্যামসাং ও মটোরোলা। তবে অ্যাপলের নতুন প্রধান নির্বাহী জন টার্নাসের দাবি, অ্যাপল ডুও ভাঁজ করা ফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে নতুন করে সাজাবে।
প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে ভাঁজ করা যায় এমন ফোনের পর্দা তৈরি করা খুব সহজ কোনো কাজ না। এর পেছনে একক কোনো আবিষ্কার বা গোপন কৌশল নেই। অনেকগুলো প্রযুক্তিগত সাফল্য একসঙ্গে এতে কাজে লাগানো হয়েছে।
এর লক্ষ্য, স্ক্রিনকে এমনভাবে তৈরি করা হবে, যেন এটি হাজার হাজার বার ভাঁজ করা যাবে এবং কোনো ক্ষতি হবে না। একই সঙ্গে এই ফোন পড়ে গেলে বা অন্য কোনো কারণে পর্দায় চাপ পড়লে পর্দাটি ঠিক থাকবে।
কাচের কথা ভাবলেই আমাদের মনে ভঙ্গুর এক বস্তু ভেসে ওঠে। একটু বেশি বাঁকাতে গেলেই কাচ ভেঙে টুকরা হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা সাধারণ কাচকে বলেন ‘অ্যামরফাস সলিড’ বা নিরাকার কঠিন পদার্থ। বাইরে থেকে কাচকে কঠিন মনে হলেও এর পরমাণুগুলো আসলে তরলের মতো অনিয়মিত বিন্যাসে আটকে থাকে।
কাচ যখন মোটা থাকে, তখন সেটিকে বাঁকাতে গেলে বাঁকা অংশের বাইরের দিকে প্রচণ্ড টান তৈরি হয়। সেই টান বা চাপ সহ্য করতে না পেরে কাচ ফেটে যায় বা ভেঙে যায়। কিন্তু কাচকে যদি খুব পাতলা করা যায়, তাহলে অবস্থা বদলে যায়।
মানুষের মাথার একটি চুল সাধারণত ৫০ থেকে ১০০ মাইক্রোমিটার পুরু। অথচ ভাঁজ করা যায় এমন আইফোনের পর্দায় ব্যবহৃত কাচের স্তরের পুরুত্ব ৩০ মাইক্রোমিটারেরও কম। এর মানে, এই কাচ মানুষের চুলের চেয়েও পাতলা। এত পাতলা করার কারণে কাচের বাঁকানো অংশের বাইরের দিকে তৈরি হওয়া টান অনেক কমে যায়। ফলে কাচ ভেঙে যাওয়ার বদলে বাঁকতে পারে।
নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের অধ্যাপক জন এ. রজার্স বিষয়টি বোঝাতে কাঠ ও কাগজের উদাহরণ দিয়েছেন। কাঠের একটি মোটা টুকরা সহজে বাঁকানো যায় না। কিন্তু সেই কাঠ দিয়েই তৈরি করা পাতলা কাগজ সহজেই ভাঁজ করা যায়, কারণ কাগজ অনেক পাতলা। কাচের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে কাজ করে। কাচ যত পাতলা হবে, একে বাঁকানো তত সহজ হবে।
শুধু কাচ পাতলা করলেই অবশ্য কাজ শেষ হয় না। কাচের রাসায়নিক গঠনও এর নমনীয়তার ওপর প্রভাব ফেলে। সাধারণ কাচ মূলত সিলিকন ডাই-অক্সাইড দিয়ে তৈরি। এটি আসে গলানো বালি থেকে। কাচ তৈরিতে অন্য কিছু রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করলেও এর নমনীয়তা বাড়ানো সম্ভব।
এর একটি উদাহরণ হলো বোরন ট্রাই-অক্সাইড। এটি মূলত পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত কাচ তৈরিতে কাজে লাগে। এ ধরনের কাচ তাপমাত্রা বাড়া-কমার সঙ্গে খুব বেশি প্রসারিত বা সংকুচিত হয় না। বোরন ট্রাই-অক্সাইডযুক্ত কাচের পরমাণুগুলোর বিন্যাস সাধারণ কাচের তুলনায় আলাদা। পরীক্ষায় দেখা গেছে, খুব পাতলা অবস্থায় এ ধরনের কাচ সাধারণ কাচের চেয়ে সহজে বাঁকতে পারে।
ভাঁজ করা যায় এমন পর্দায় শুধু কাচ থাকে না। এর আরেকটি স্তর তৈরি করা হয় অত্যন্ত টেকসই ও স্বচ্ছ প্লাস্টিক দিয়ে। এই প্লাস্টিককে এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেন পর্দাটি কয়েক লাখবার ভাঁজ করলেও সেটি ঘোলা হয়ে যায় না বা নিজের আকার বদলে ফেলে না।
পর্দার বিভিন্ন স্তরকে একসঙ্গে জোড়া লাগানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ ধরনের স্বচ্ছ আঠা। শিল্পক্ষেত্রে এগুলোকে ‘অপটিক্যালি ক্লিয়ার অ্যাডহেসিভ’ বলা হয়। দেখতে অনেকটা জেলের মতো এই আঠা বিভিন্ন স্তরকে শক্তভাবে ধরে রাখে।
কিন্তু পর্দা বাঁকানোর সময় স্তরগুলোতে চাপ পড়লে এরা সামান্য পরিমাণে একে অপরের ওপর দিয়ে সরে যেতে পারে। ফলে ভাঁজ করার সময় পর্দার ভেতরের স্তরগুলো একে অপরের সঙ্গে শক্তভাবে আটকে থাকে না। ফলে পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। এভাবে বেশ কিছু প্রযুক্তিকে একসঙ্গে করে তৈরি হয়েছে আইফোন ডুও, যেটা ভাঁজ হবে, কিন্তু ভাঙবে না।




























