কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় বিয়ের প্রলোভনে এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে এক যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার দুপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এই রায় ঘোষণা করেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না
এবং তাকে পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত জনি হোসেন ওরফে রাজিম ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর ইউনিয়নের ১৬ দাগ পশ্চিমপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন এবং প্রতারণার মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের মাধ্যমে ওই তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন জনি। নিজেকে সেনাসদস্য পরিচয় দিয়ে তিনি ভুক্তভোগীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি রাতে তরুণীর বাড়িতে তার বাবা-মায়ের অনুপস্থিতির সুযোগে প্রথমবার ধর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এরপর বিয়ের আশ্বাস দিয়ে একাধিকবার একই ঘটনা ঘটানো হয়। ধীরে ধীরে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে ওই তরুণী গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। বিষয়টি পরিবারে জানাজানি হলে জনিকে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়।
এ সময় আসামি নানা অজুহাত দেখিয়ে ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করেন। তিনি পদোন্নতি ও চাকরিসংক্রান্ত খরচের কথা বলে
মোট আট লাখ টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে ভুক্তভোগীর প্রবাসী বাবা সেই টাকা প্রদান করেন।
তবে টাকা পাওয়ার পরই জনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। শুধু তাই নয়, তিনি ভুক্তভোগীকে ‘চরিত্রহীন’ বলে অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে জানা যায়। এই আচরণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং পরিবার চরম সংকটে পড়ে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২ মার্চ ওই তরুণী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। এ অবস্থায় কোনো উপায় না পেয়ে তিনি আইনের আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০২৩ সালের ২২ জুন তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় স্থানীয় থানা পুলিশ এবং প্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। তদন্তের একপর্যায়ে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা হয় বলে তদন্ত কর্মকর্তারা জানান। প্রাপ্ত তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মামলাটি আরও শক্ত ভিত্তি পায়। পরবর্তীতে তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।চার্জশিটে আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জানান, সাক্ষ্য-প্রমাণে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
আসামি জনি হোসেন ২০২৩ সালের ১৫ জুলাই গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন কারাগারে ছিলেন। পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি পলাতক হয়ে যান বলে জানা গেছে। আদালত তার অনুপস্থিতিতেই রায় ঘোষণা করেন এবং তাকে দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আটক করতে
অভিযান চালাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এই রায়কে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা, কারণ এতে প্রতারণা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে কঠোর শাস্তির বার্তা দেওয়া হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। অপরিচিত ব্যক্তির পরিচয় যাচাই না করে সম্পর্ক গড়ে তোলা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তারা আরও বলেন, এমন ঘটনায় দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এবং প্রমাণ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন।

























