বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে আবারও ইতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে। চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ২৯ দিনেই প্রবাসী আয়ে বড় উল্লম্ফন ঘটেছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে দেশে এসেছে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স—যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, এপ্রিলের প্রথম ২৯ দিনে মোট ৩০০ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বা ৩.০০২ বিলিয়ন ডলার দেশে এসেছে। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ কোটি ৩৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স প্রবাহিত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত বহন করছে।
গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে এ প্রবৃদ্ধি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের এপ্রিলের একই সময়ে দেশে এসেছিল ২৬০ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। সেই হিসেবে বছর ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রবাসী আয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি এবং সরকারের নানা প্রণোদনা এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৯২১ কোটি ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৯ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য রক্ষা এবং ডলারের চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে মার্চ মাসেও রেমিট্যান্সে রেকর্ড গড়েছিল বাংলাদেশ। ওই মাসে দেশে আসে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, যা একক মাস হিসেবে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ধারাবাহিকভাবে কয়েক মাস ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির এই ধারা অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রবাসীদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর আগ্রহ বাড়ছে। পাশাপাশি হুন্ডি প্রতিরোধে সরকারের কড়াকড়ি এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রণোদনা প্রদান—এই দুইটি বিষয় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও প্রবাসী আয় নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ওই অর্থবছরে মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার বা ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে আসে, যা কোনো একক অর্থবছরের জন্য সর্বোচ্চ রেকর্ড। চলতি অর্থবছরে সেই রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় মেটানো, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাচ্ছে। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এটি বড় সহায়ক শক্তি হয়ে উঠবে।



























