গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের গায়েব করছে ইসরাইল—এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে বহু মানুষ নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় প্রতি সপ্তাহেই কয়েক ডজন শিশু নিখোঁজ হচ্ছে। যুদ্ধ-পরবর্তী বিশৃঙ্খলা, বাস্তুচ্যুতি এবং নিরাপত্তাহীন পরিবেশ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এতে করে পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনদের খুঁজে পেতে দিশেহারা হয়ে পড়ছে।
একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলা হয়, উত্তর গাজার একটি এলাকায় খেলতে গিয়ে হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যায় চার বছরের এক শিশু। পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজে না পেয়ে চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং অনেক পরিবারের জন্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যুদ্ধ চলাকালে হাজার হাজার শিশু নিখোঁজ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ধারণা করা হচ্ছে, তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে তাদের কোনো খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না, যা পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে গাজায় বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি নিখোঁজের ঘটনাও বেড়েছে। হতাহতদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ অনেকেই এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধের একটি ভয়াবহ দিক হলো—নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। এতে শুধু প্রাণহানি নয়, বরং পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানসিক যন্ত্রণা তৈরি হয়। প্রিয়জনের অবস্থান সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তাদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিনিধি ও মানবাধিকার কর্মীরা গাজা পরিস্থিতিকে গুরুতর মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করছেন। তারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে শুধুমাত্র সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। তারা বলছেন, যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নিখোঁজের সংখ্যা বাড়তেই থাকছে। গাজায় বসবাসকারী মানুষেরা প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তারা জানেন না, পরবর্তী মুহূর্তে কী ঘটতে পারে বা তাদের প্রিয়জনদের ভাগ্যে কী আছে। এই ভয় ও অনিশ্চয়তা পুরো অঞ্চলে এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে হাজার হাজার পরিবারের কষ্ট, যন্ত্রণার গল্প এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অতীতেও জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটেছে। তবে গাজায় বর্তমান পরিস্থিতি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিখোঁজের ঘটনা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। নিখোঁজদের খুঁজে বের করা এবং পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া জরুরি। গাজা সংকট বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও, অনেক সময় অন্যান্য ইস্যুর কারণে এটি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। ফলে নিখোঁজ মানুষের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, ফিলিস্তিনিদের গায়েব করছে ইসরাইল—এই অভিযোগ শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং একটি মানবিক সংকটের প্রতিফলন। এর সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্বচ্ছ তদন্ত অপরিহার্য।



























