ঢাকা ০১:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

লাশ চুরি থেকে কঙ্কাল বাণিজ্য, বিস্তৃত ভয়ংকর সিন্ডিকেট

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৯:৫৫:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
  • ৫২৫

চিত্রঃ লাশ চুরি করে কঙ্কাল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত চক্র নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে দেশে।

বাংলাদেশে বহু বছর ধরে নীরবে বিস্তার লাভ করেছে লাশ চুরি করে কঙ্কাল বাণিজ্য নামের ভয়ংকর এক অমানবিক ব্যবসা। গভীর রাতে কবর খুঁড়ে সদ্য দাফন করা লাশ তুলে এনে সেখান থেকে হাড় আলাদা করে তৈরি করা হচ্ছে মানব কঙ্কাল। পরে এসব কঙ্কাল বিভিন্ন হাত ঘুরে পৌঁছে যাচ্ছে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার উপকরণ হিসেবে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগেও এমন নির্মম ও অনৈতিক বাণিজ্য চালু থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার নতুন মেডিকেল শিক্ষার্থী অ্যানাটমি শিক্ষার জন্য মানব কঙ্কাল ব্যবহার করেন। কিন্তু এসব কঙ্কাল সংগ্রহের কোনো বৈধ রাষ্ট্রীয় কাঠামো না থাকায় গড়ে উঠেছে বিশাল অবৈধ সিন্ডিকেট। কবর থেকে লাশ চুরি করে হাড় সংগ্রহ, রাসায়নিক দিয়ে মাংস গলিয়ে কঙ্কাল তৈরি এবং পরে তা বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই ব্যবসা এখন কয়েক কোটি টাকার বাজারে পরিণত হয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ মানব কঙ্কাল ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক ব্যবহার এবং পরীক্ষার চাপে এই চাহিদা টিকে আছে বছরের পর বছর।

চিকিৎসা শিক্ষার শুরুতেই শিক্ষার্থীদের অনেককে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই অবৈধ বাণিজ্যের অংশ হতে হচ্ছে। কারণ অধিকাংশ মেডিকেল কলেজে অ্যানাটমি ক্লাস ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় বাস্তব হাড় দেখিয়ে পড়ানো হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে বাজার থেকে এসব কঙ্কাল সংগ্রহ করেন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অতীতে এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে ছিল রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী চক্র। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজকেন্দ্রিক ছাত্রসংগঠনের নেতারা কঙ্কাল সরবরাহের বড় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সিন্ডিকেটের একটি অংশ কবর থেকে লাশ তুলে আনত, আরেকটি অংশ হাড় আলাদা করার কাজ করত এবং প্রভাবশালীরা তা বিভিন্ন কলেজে সরবরাহ করতেন।

একাধিক সাবেক মেডিকেল শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু ব্যক্তি আত্মগোপনে গেলেও ব্যবসাটি বন্ধ হয়নি। বরং নতুনভাবে অনলাইনভিত্তিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় একটি ডেন্টাল কলেজের ছাত্রাবাস থেকে বিপুলসংখ্যক মাথার খুলি ও হাড় উদ্ধার হওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আনে এই সিন্ডিকেটকে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর একাধিক এলাকা থেকে কঙ্কাল উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব ঘটনায় প্রমাণ মিলেছে যে, অবৈধ কঙ্কাল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে নানা স্তরের ব্যক্তি জড়িত।

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অনেকেই জানিয়েছেন, পড়াশোনা শেষে এসব হাড়ের যথাযথ সংরক্ষণ বা সম্মানজনক নিষ্পত্তি হয় না। অনেক ক্ষেত্রে হাড় ডাস্টবিন কিংবা নর্দমায় ফেলে দেওয়া হয়। এতে মৃত মানুষের মর্যাদা চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের উন্নত  দেশগুলো অনেক আগেই মানব কঙ্কালনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি থেকে সরে এসেছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মানবদেহের অত্যন্ত নিখুঁত অঙ্গসংস্থান শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা কম্পিউটারের মাধ্যমে মানুষের হাড়ের সূক্ষ্ম গঠন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব হচ্ছে।

‘কমপ্লিট অ্যানাটমি’র মতো আধুনিক অ্যাপ্লিকেশন এখন চিকিৎসা শিক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এসব প্রযুক্তিতে মানুষের হাড়, স্নায়ু, পেশি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গঠন অনেক বেশি পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। ফলে বাস্তব হাড় ব্যবহার ছাড়াও মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া সম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, উন্নত বিশ্বে বর্তমানে অধিকাংশ মেডিকেল কলেজে প্লাস্টিক বা সিনথেটিক কঙ্কাল ব্যবহার করা হয়। এসব কঙ্কাল প্রায় বাস্তবের মতোই নিখুঁত এবং সম্পূর্ণ আইনসম্মত। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় বলে এগুলো অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক।

ভারত, চীন, ইউরোপ ও আমেরিকার মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় এখন থ্রিডি সিমুলেশন ও ভার্চুয়াল অ্যানাটমি শিক্ষাই প্রধান মাধ্যম। সেখানে কেবল যেসব ব্যক্তি মৃত্যুর আগে স্বেচ্ছায় দেহদান করে গেছেন, তাদের মরদেহ বা হাড় বিশেষ গবেষণা কিংবা জাদুঘরে ব্যবহৃত হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি কঠোর নৈতিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে এখনো পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা থাকায় লাশ চুরি করে কঙ্কাল বাণিজ্য টিকে আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, “আসল হাড় স্পর্শ না করলে শিক্ষা পূর্ণ হয় না” — এই ধারণা এখন সময়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. শেখ মোহাম্মদ ইরফান বলেন, দেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মেডিকেল শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও বৈধভাবে এত কঙ্কাল সংগ্রহ করা বাস্তবে অসম্ভব। ফলে অপরাধচক্র সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিটি মেডিকেল কলেজ যদি নিজস্ব তত্ত্বাবধানে সীমিতসংখ্যক কঙ্কাল সংরক্ষণ করে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্লাস্টিক মডেল ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে, তাহলে নতুন কঙ্কালের চাহিদা অনেকটাই কমে যাবে।

চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, লাশ চুরি ঠেকাতে শুধু আইনশৃঙ্খলা অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নীতিগত পরিবর্তন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি মেডিকেল শিক্ষায় বাস্তব হাড় ব্যবহারের পরিবর্তে থ্রিডি প্রযুক্তি ও প্লাস্টিক মডেল বাধ্যতামূলক করে, তাহলে এই অবৈধ বাজার দ্রুত ভেঙে পড়বে। মানবদেহের প্রতি সম্মান, চিকিৎসাবিজ্ঞানের নৈতিকতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রশ্নে এখন নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় প্রযুক্তির যুগেও কবর খুঁড়ে লাশ চুরি করে কঙ্কাল বাণিজ্যের এই অন্ধকার অধ্যায় চলতেই থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগ নেতা বিএনপিতে যোগদান

লাশ চুরি থেকে কঙ্কাল বাণিজ্য, বিস্তৃত ভয়ংকর সিন্ডিকেট

Update Time : ০৯:৫৫:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

বাংলাদেশে বহু বছর ধরে নীরবে বিস্তার লাভ করেছে লাশ চুরি করে কঙ্কাল বাণিজ্য নামের ভয়ংকর এক অমানবিক ব্যবসা। গভীর রাতে কবর খুঁড়ে সদ্য দাফন করা লাশ তুলে এনে সেখান থেকে হাড় আলাদা করে তৈরি করা হচ্ছে মানব কঙ্কাল। পরে এসব কঙ্কাল বিভিন্ন হাত ঘুরে পৌঁছে যাচ্ছে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার উপকরণ হিসেবে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগেও এমন নির্মম ও অনৈতিক বাণিজ্য চালু থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার নতুন মেডিকেল শিক্ষার্থী অ্যানাটমি শিক্ষার জন্য মানব কঙ্কাল ব্যবহার করেন। কিন্তু এসব কঙ্কাল সংগ্রহের কোনো বৈধ রাষ্ট্রীয় কাঠামো না থাকায় গড়ে উঠেছে বিশাল অবৈধ সিন্ডিকেট। কবর থেকে লাশ চুরি করে হাড় সংগ্রহ, রাসায়নিক দিয়ে মাংস গলিয়ে কঙ্কাল তৈরি এবং পরে তা বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই ব্যবসা এখন কয়েক কোটি টাকার বাজারে পরিণত হয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ মানব কঙ্কাল ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক ব্যবহার এবং পরীক্ষার চাপে এই চাহিদা টিকে আছে বছরের পর বছর।

চিকিৎসা শিক্ষার শুরুতেই শিক্ষার্থীদের অনেককে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই অবৈধ বাণিজ্যের অংশ হতে হচ্ছে। কারণ অধিকাংশ মেডিকেল কলেজে অ্যানাটমি ক্লাস ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় বাস্তব হাড় দেখিয়ে পড়ানো হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে বাজার থেকে এসব কঙ্কাল সংগ্রহ করেন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অতীতে এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে ছিল রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী চক্র। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজকেন্দ্রিক ছাত্রসংগঠনের নেতারা কঙ্কাল সরবরাহের বড় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সিন্ডিকেটের একটি অংশ কবর থেকে লাশ তুলে আনত, আরেকটি অংশ হাড় আলাদা করার কাজ করত এবং প্রভাবশালীরা তা বিভিন্ন কলেজে সরবরাহ করতেন।

আরও পড়ুন  দিনাজপুরে অগ্নিকাণ্ডে দম্পতি মৃত্যু: শোকের ছায়া এলাকায়।

একাধিক সাবেক মেডিকেল শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু ব্যক্তি আত্মগোপনে গেলেও ব্যবসাটি বন্ধ হয়নি। বরং নতুনভাবে অনলাইনভিত্তিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় একটি ডেন্টাল কলেজের ছাত্রাবাস থেকে বিপুলসংখ্যক মাথার খুলি ও হাড় উদ্ধার হওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আনে এই সিন্ডিকেটকে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর একাধিক এলাকা থেকে কঙ্কাল উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব ঘটনায় প্রমাণ মিলেছে যে, অবৈধ কঙ্কাল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে নানা স্তরের ব্যক্তি জড়িত।

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অনেকেই জানিয়েছেন, পড়াশোনা শেষে এসব হাড়ের যথাযথ সংরক্ষণ বা সম্মানজনক নিষ্পত্তি হয় না। অনেক ক্ষেত্রে হাড় ডাস্টবিন কিংবা নর্দমায় ফেলে দেওয়া হয়। এতে মৃত মানুষের মর্যাদা চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের উন্নত  দেশগুলো অনেক আগেই মানব কঙ্কালনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি থেকে সরে এসেছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মানবদেহের অত্যন্ত নিখুঁত অঙ্গসংস্থান শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা কম্পিউটারের মাধ্যমে মানুষের হাড়ের সূক্ষ্ম গঠন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব হচ্ছে।

আরও পড়ুন  বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২৬: সত্য প্রকাশের লড়াই ও আগামীর সাংবাদিকতা

‘কমপ্লিট অ্যানাটমি’র মতো আধুনিক অ্যাপ্লিকেশন এখন চিকিৎসা শিক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এসব প্রযুক্তিতে মানুষের হাড়, স্নায়ু, পেশি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গঠন অনেক বেশি পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। ফলে বাস্তব হাড় ব্যবহার ছাড়াও মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া সম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, উন্নত বিশ্বে বর্তমানে অধিকাংশ মেডিকেল কলেজে প্লাস্টিক বা সিনথেটিক কঙ্কাল ব্যবহার করা হয়। এসব কঙ্কাল প্রায় বাস্তবের মতোই নিখুঁত এবং সম্পূর্ণ আইনসম্মত। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় বলে এগুলো অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক।

ভারত, চীন, ইউরোপ ও আমেরিকার মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় এখন থ্রিডি সিমুলেশন ও ভার্চুয়াল অ্যানাটমি শিক্ষাই প্রধান মাধ্যম। সেখানে কেবল যেসব ব্যক্তি মৃত্যুর আগে স্বেচ্ছায় দেহদান করে গেছেন, তাদের মরদেহ বা হাড় বিশেষ গবেষণা কিংবা জাদুঘরে ব্যবহৃত হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি কঠোর নৈতিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে এখনো পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা থাকায় লাশ চুরি করে কঙ্কাল বাণিজ্য টিকে আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, “আসল হাড় স্পর্শ না করলে শিক্ষা পূর্ণ হয় না” — এই ধারণা এখন সময়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

আরও পড়ুন  তিন মাসে ৮৫৪ খুন বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড বাড়ছে

চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. শেখ মোহাম্মদ ইরফান বলেন, দেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মেডিকেল শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও বৈধভাবে এত কঙ্কাল সংগ্রহ করা বাস্তবে অসম্ভব। ফলে অপরাধচক্র সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিটি মেডিকেল কলেজ যদি নিজস্ব তত্ত্বাবধানে সীমিতসংখ্যক কঙ্কাল সংরক্ষণ করে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্লাস্টিক মডেল ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে, তাহলে নতুন কঙ্কালের চাহিদা অনেকটাই কমে যাবে।

চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, লাশ চুরি ঠেকাতে শুধু আইনশৃঙ্খলা অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নীতিগত পরিবর্তন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি মেডিকেল শিক্ষায় বাস্তব হাড় ব্যবহারের পরিবর্তে থ্রিডি প্রযুক্তি ও প্লাস্টিক মডেল বাধ্যতামূলক করে, তাহলে এই অবৈধ বাজার দ্রুত ভেঙে পড়বে। মানবদেহের প্রতি সম্মান, চিকিৎসাবিজ্ঞানের নৈতিকতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রশ্নে এখন নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় প্রযুক্তির যুগেও কবর খুঁড়ে লাশ চুরি করে কঙ্কাল বাণিজ্যের এই অন্ধকার অধ্যায় চলতেই থাকবে।