ঢাকা ০৫:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আশুরা নিয়ে প্রচলিত ১১ ভুল ধারণা ও ইসলামের সঠিক দিকনির্দেশনা

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০২:২৬:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
  • ৫১৩

চিত্রঃ আশুরা সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা ও সহিহ তথ্য। (সংগৃহীত)

আশুরা নিয়ে প্রচলিত ১১ ভুল ধারণা আজও মুসলিম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। মহররম মাসের ১০ তারিখ, অর্থাৎ আশুরা, ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। এই দিনকে কেন্দ্র করে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা, শিক্ষা এবং ইবাদতের গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশুরাকে ঘিরে নানা কুসংস্কার, জাল বর্ণনা এবং ভিত্তিহীন বিশ্বাস সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেক মানুষ সহিহ সুন্নাহর অনুসরণের পরিবর্তে লোকমুখে প্রচলিত রীতিনীতিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

 

ইসলাম মানুষকে দলিলভিত্তিক জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। তাই আশুরা সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো দূর করা এবং সহিহ তথ্য জানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি। নিচে আশুরা নিয়ে বহুল প্রচলিত কয়েকটি ভুল ধারণা এবং সেগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো।

 

১. আশুরার গুরুত্ব শুধু কারবালার ঘটনার কারণে

অনেকেই মনে করেন, কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার কারণেই আশুরা গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। বাস্তবে এই ধারণা সঠিক নয়। কারবালার ঘটনা সংঘটিত হওয়ার বহু বছর আগেই আশুরা ইসলামে মর্যাদাপূর্ণ দিন হিসেবে পরিচিত ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখেন, ইহুদিরা এ দিনে রোজা রাখে। কারণ হিসেবে তারা জানান, এই দিনে আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও রোজা রাখেন এবং সাহাবিদের রোজা রাখার নির্দেশ দেন।

 

২. মহররমের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখলে ১০ হাজার বছরের সওয়াব

সমাজে এমন কিছু বই ও বক্তব্য পাওয়া যায় যেখানে দাবি করা হয়, মহররমের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখলে হাজার হাজার বছরের ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়। মুহাদ্দিসগণ এ ধরনের বর্ণনাকে সম্পূর্ণ জাল ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। ইসলামে কোনো আমলের ফজিলত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সহিহ কোরআন ও হাদিসই একমাত্র গ্রহণযোগ্য উৎস। তাই অতিরঞ্জিত সওয়াবের গল্প প্রচার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

 

৩. শুধু ১০ মহররমে রোজা রাখাই যথেষ্ট

অনেক মুসলমান মনে করেন, শুধু আশুরার দিন একটি রোজা রাখলেই সুন্নাহ পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহুদিদের সঙ্গে পার্থক্য বজায় রাখার জন্য ৯ মহররমেও রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণে অধিকাংশ আলেম ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখাকে উত্তম বলে মত দিয়েছেন। এতে সুন্নাহর অনুসরণ আরও পরিপূর্ণ হয়।

 

৪. আশুরার রাতে বিশেষ নামাজের বিধান আছে

কিছু মানুষের বিশ্বাস, আশুরার রাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাতের বিশেষ নামাজ আদায় করলে সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়। কোথাও ১২ রাকাত, কোথাও ১০০ রাকাত নামাজের কথা বলা হয়। কিন্তু এ ধরনের বর্ণনার কোনো সহিহ ভিত্তি নেই। প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণ এসব বর্ণনাকে জাল বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই আশুরার নামে নতুন কোনো ইবাদত উদ্ভাবন করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

৫. নির্দিষ্ট আমলে সব গুনাহ মাফ হওয়ার নিশ্চয়তা

অনেক প্রচলিত বইয়ে দাবি করা হয়, আশুরার রাতে নির্দিষ্ট দোয়া বা তাসবিহ পড়লে নিশ্চিত জান্নাত পাওয়া যাবে অথবা জীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। ইসলামে এমন নিশ্চয়তামূলক দাবি করার সুযোগ নেই, যদি না তা সহিহ দলিল দ্বারা প্রমাণিত হয়। মুসলমানের দায়িত্ব হলো আল্লাহর রহমতের আশা করা এবং আন্তরিকভাবে ইবাদত করা।

 

৬. বিশেষ গোসল করলে সারা বছর নিরাপদ থাকা যায়

কিছু এলাকায় বিশ্বাস করা হয়, আশুরার দিন বিশেষভাবে গোসল করলে সারা বছর রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকা যায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করলে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়। এই দাবিগুলোর পক্ষে কোনো সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। তাই এগুলোকে ধর্মীয় আমল হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

৭. সুরমা, মেহেদি বা তেল ব্যবহারের বিশেষ ফজিলত

প্রচলিত কিছু বর্ণনায় বলা হয়, আশুরার দিন সুরমা ব্যবহার করলে চোখের রোগ হয় না কিংবা মেহেদি লাগালে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়। বিশ্বস্ত হাদিসগ্রন্থে এসব দাবির কোনো প্রমাণ নেই। তাই এগুলোকে সুন্নাহ মনে করে পালন করা সঠিক নয়।

 

৮. খিচুড়ি বা বিশেষ খাবার রান্না করা ধর্মীয় আমল

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আশুরার দিনে খিচুড়ি, হালুয়া কিংবা বিশেষ খাবার রান্নার রেওয়াজ রয়েছে। অনেকেই এটিকে ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। খাবার রান্না করা অবশ্যই বৈধ কাজ। কিন্তু আশুরার বিশেষ আমল হিসেবে এর কোনো সহিহ ভিত্তি নেই। তাই এটিকে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া উচিত নয়।

 

৯. মাতম ও আত্মনিপীড়নকে ইবাদত মনে করা

কারবালার ঘটনার স্মরণে বুক চাপড়ানো, শরীর আঘাত করা কিংবা নিজেকে রক্তাক্ত করা কিছু সমাজে প্রচলিত রয়েছে। ইসলাম এমন আচরণকে সমর্থন করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) শোক প্রকাশের নামে আত্মনিপীড়ন ও জাহেলি যুগের বিলাপ থেকে মুসলমানদের বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।

 

১০. আশুরাকে শুধু শোক বা শুধু উৎসবের দিন বানানো

একদল মানুষ আশুরাকে শুধুই শোকের দিন মনে করে, আবার অন্যরা এটিকে আনন্দ-উৎসবের দিনে পরিণত করে। প্রকৃতপক্ষে আশুরা কোনো উৎসবের দিন নয় এবং কেবল শোকের দিনও নয়। এটি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, আত্মসমালোচনা, তওবা এবং শিক্ষা গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।

 

১১. মহররম মাসে বিয়ে করা অশুভ

আমাদের সমাজে এখনও অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন, মহররম মাসে বিয়ে করলে সংসারে অশান্তি বা অমঙ্গল নেমে আসে। ইসলামে এমন কোনো বিশ্বাসের ভিত্তি নেই। কোরআন ও হাদিসে মহররম মাসে বিয়ে নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয় হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই এই ধারণা সম্পূর্ণ কুসংস্কার।

 

আশুরার প্রকৃত শিক্ষা কী?

আশুরা মুসলমানদের জন্য ত্যাগ, ধৈর্য, সত্যের প্রতি অবিচলতা এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার শিক্ষা বহন করে। এ দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রমাণিত আমল হলো রোজা রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা সম্পর্কে বলেছেন, তিনি আশা করেন আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করবেন। তাই মুসলমানদের উচিত জাল বর্ণনা, কুসংস্কার ও বিদআত থেকে দূরে থেকে সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী আশুরা পালন করা।

 

উপসংহার

আশুরা নিয়ে প্রচলিত ১১ ভুল ধারণা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। অনেক সময় মানুষ সহিহ আমলের পরিবর্তে ভিত্তিহীন রীতিনীতিকে ধর্মের অংশ মনে করে অনুসরণ করে থাকে। ইসলামের শিক্ষা হলো কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করা। তাই আশুরা উপলক্ষে আমাদের উচিত সঠিক জ্ঞান অর্জন করা, প্রমাণিত আমল পালন করা এবং সমাজে ছড়িয়ে থাকা ভুল ধারণাগুলো সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। সহিহ ইসলামী জ্ঞানই পারে কুসংস্কার ও বিদআতমুক্ত একটি সচেতন সমাজ গড়ে তুলতে।

জনপ্রিয় সংবাদ

আশুরা নিয়ে প্রচলিত ১১ ভুল ধারণা ও ইসলামের সঠিক দিকনির্দেশনা

Update Time : ০২:২৬:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

আশুরা নিয়ে প্রচলিত ১১ ভুল ধারণা আজও মুসলিম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। মহররম মাসের ১০ তারিখ, অর্থাৎ আশুরা, ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। এই দিনকে কেন্দ্র করে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা, শিক্ষা এবং ইবাদতের গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশুরাকে ঘিরে নানা কুসংস্কার, জাল বর্ণনা এবং ভিত্তিহীন বিশ্বাস সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেক মানুষ সহিহ সুন্নাহর অনুসরণের পরিবর্তে লোকমুখে প্রচলিত রীতিনীতিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

 

ইসলাম মানুষকে দলিলভিত্তিক জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। তাই আশুরা সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো দূর করা এবং সহিহ তথ্য জানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি। নিচে আশুরা নিয়ে বহুল প্রচলিত কয়েকটি ভুল ধারণা এবং সেগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো।

 

১. আশুরার গুরুত্ব শুধু কারবালার ঘটনার কারণে

অনেকেই মনে করেন, কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার কারণেই আশুরা গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। বাস্তবে এই ধারণা সঠিক নয়। কারবালার ঘটনা সংঘটিত হওয়ার বহু বছর আগেই আশুরা ইসলামে মর্যাদাপূর্ণ দিন হিসেবে পরিচিত ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখেন, ইহুদিরা এ দিনে রোজা রাখে। কারণ হিসেবে তারা জানান, এই দিনে আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও রোজা রাখেন এবং সাহাবিদের রোজা রাখার নির্দেশ দেন।

 

২. মহররমের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখলে ১০ হাজার বছরের সওয়াব

সমাজে এমন কিছু বই ও বক্তব্য পাওয়া যায় যেখানে দাবি করা হয়, মহররমের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখলে হাজার হাজার বছরের ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়। মুহাদ্দিসগণ এ ধরনের বর্ণনাকে সম্পূর্ণ জাল ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। ইসলামে কোনো আমলের ফজিলত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সহিহ কোরআন ও হাদিসই একমাত্র গ্রহণযোগ্য উৎস। তাই অতিরঞ্জিত সওয়াবের গল্প প্রচার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

আরও পড়ুন  নামাজে সালাম ফেরানোর সঠিক নিয়ম ও সুন্নাহ পদ্ধতি

 

৩. শুধু ১০ মহররমে রোজা রাখাই যথেষ্ট

অনেক মুসলমান মনে করেন, শুধু আশুরার দিন একটি রোজা রাখলেই সুন্নাহ পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহুদিদের সঙ্গে পার্থক্য বজায় রাখার জন্য ৯ মহররমেও রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণে অধিকাংশ আলেম ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখাকে উত্তম বলে মত দিয়েছেন। এতে সুন্নাহর অনুসরণ আরও পরিপূর্ণ হয়।

 

৪. আশুরার রাতে বিশেষ নামাজের বিধান আছে

কিছু মানুষের বিশ্বাস, আশুরার রাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাতের বিশেষ নামাজ আদায় করলে সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়। কোথাও ১২ রাকাত, কোথাও ১০০ রাকাত নামাজের কথা বলা হয়। কিন্তু এ ধরনের বর্ণনার কোনো সহিহ ভিত্তি নেই। প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণ এসব বর্ণনাকে জাল বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই আশুরার নামে নতুন কোনো ইবাদত উদ্ভাবন করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

৫. নির্দিষ্ট আমলে সব গুনাহ মাফ হওয়ার নিশ্চয়তা

অনেক প্রচলিত বইয়ে দাবি করা হয়, আশুরার রাতে নির্দিষ্ট দোয়া বা তাসবিহ পড়লে নিশ্চিত জান্নাত পাওয়া যাবে অথবা জীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। ইসলামে এমন নিশ্চয়তামূলক দাবি করার সুযোগ নেই, যদি না তা সহিহ দলিল দ্বারা প্রমাণিত হয়। মুসলমানের দায়িত্ব হলো আল্লাহর রহমতের আশা করা এবং আন্তরিকভাবে ইবাদত করা।

আরও পড়ুন  মহররমের প্রথম দিন ২০২৬ |

 

৬. বিশেষ গোসল করলে সারা বছর নিরাপদ থাকা যায়

কিছু এলাকায় বিশ্বাস করা হয়, আশুরার দিন বিশেষভাবে গোসল করলে সারা বছর রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকা যায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করলে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়। এই দাবিগুলোর পক্ষে কোনো সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। তাই এগুলোকে ধর্মীয় আমল হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

৭. সুরমা, মেহেদি বা তেল ব্যবহারের বিশেষ ফজিলত

প্রচলিত কিছু বর্ণনায় বলা হয়, আশুরার দিন সুরমা ব্যবহার করলে চোখের রোগ হয় না কিংবা মেহেদি লাগালে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়। বিশ্বস্ত হাদিসগ্রন্থে এসব দাবির কোনো প্রমাণ নেই। তাই এগুলোকে সুন্নাহ মনে করে পালন করা সঠিক নয়।

 

৮. খিচুড়ি বা বিশেষ খাবার রান্না করা ধর্মীয় আমল

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আশুরার দিনে খিচুড়ি, হালুয়া কিংবা বিশেষ খাবার রান্নার রেওয়াজ রয়েছে। অনেকেই এটিকে ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। খাবার রান্না করা অবশ্যই বৈধ কাজ। কিন্তু আশুরার বিশেষ আমল হিসেবে এর কোনো সহিহ ভিত্তি নেই। তাই এটিকে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া উচিত নয়।

 

৯. মাতম ও আত্মনিপীড়নকে ইবাদত মনে করা

কারবালার ঘটনার স্মরণে বুক চাপড়ানো, শরীর আঘাত করা কিংবা নিজেকে রক্তাক্ত করা কিছু সমাজে প্রচলিত রয়েছে। ইসলাম এমন আচরণকে সমর্থন করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) শোক প্রকাশের নামে আত্মনিপীড়ন ও জাহেলি যুগের বিলাপ থেকে মুসলমানদের বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।

 

১০. আশুরাকে শুধু শোক বা শুধু উৎসবের দিন বানানো

একদল মানুষ আশুরাকে শুধুই শোকের দিন মনে করে, আবার অন্যরা এটিকে আনন্দ-উৎসবের দিনে পরিণত করে। প্রকৃতপক্ষে আশুরা কোনো উৎসবের দিন নয় এবং কেবল শোকের দিনও নয়। এটি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, আত্মসমালোচনা, তওবা এবং শিক্ষা গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।

আরও পড়ুন  পর্দার বিধান পালনে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়

 

১১. মহররম মাসে বিয়ে করা অশুভ

আমাদের সমাজে এখনও অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন, মহররম মাসে বিয়ে করলে সংসারে অশান্তি বা অমঙ্গল নেমে আসে। ইসলামে এমন কোনো বিশ্বাসের ভিত্তি নেই। কোরআন ও হাদিসে মহররম মাসে বিয়ে নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয় হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই এই ধারণা সম্পূর্ণ কুসংস্কার।

 

আশুরার প্রকৃত শিক্ষা কী?

আশুরা মুসলমানদের জন্য ত্যাগ, ধৈর্য, সত্যের প্রতি অবিচলতা এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার শিক্ষা বহন করে। এ দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রমাণিত আমল হলো রোজা রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা সম্পর্কে বলেছেন, তিনি আশা করেন আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করবেন। তাই মুসলমানদের উচিত জাল বর্ণনা, কুসংস্কার ও বিদআত থেকে দূরে থেকে সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী আশুরা পালন করা।

 

উপসংহার

আশুরা নিয়ে প্রচলিত ১১ ভুল ধারণা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। অনেক সময় মানুষ সহিহ আমলের পরিবর্তে ভিত্তিহীন রীতিনীতিকে ধর্মের অংশ মনে করে অনুসরণ করে থাকে। ইসলামের শিক্ষা হলো কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করা। তাই আশুরা উপলক্ষে আমাদের উচিত সঠিক জ্ঞান অর্জন করা, প্রমাণিত আমল পালন করা এবং সমাজে ছড়িয়ে থাকা ভুল ধারণাগুলো সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। সহিহ ইসলামী জ্ঞানই পারে কুসংস্কার ও বিদআতমুক্ত একটি সচেতন সমাজ গড়ে তুলতে।