পাইলস বা অর্শ রোগে আক্রান্ত হলেও অনেক মানুষ লজ্জা কিংবা সংকোচের কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। ফলে রোগটি দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকে এবং পরে জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইলসের প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক সমস্যাই জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ভারতের মুম্বাইয়ের চেম্বুরের জেন মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের ডিরেক্টর ও গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল এবং ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন ডা. রয় পাটানকর জানিয়েছেন, সব ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন হয় না, তবে রোগের অবস্থা বুঝে চিকিৎসা নিতে হবে।
পাইলস বা হেমোরয়েডস হলো মলদ্বার ও রেকটামের নিচের অংশের শিরা ফুলে যাওয়া। এটি বর্তমানে খুবই সাধারণ একটি স্বাস্থ্য সমস্যা। অনেকেই দীর্ঘদিন এ সমস্যায় ভুগলেও সঠিক চিকিৎসা না নিয়ে বিভিন্ন ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন, যা অনেক সময় ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পাইলস কেন হয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইলস হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা। এতে মলদ্বারের শিরাগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়ে এবং ধীরে ধীরে সেগুলো ফুলে যায়।
পাইলস হওয়ার সাধারণ কারণগুলো হলো—
- দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা
- মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত জোর দেওয়া
- কম আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া
- পর্যাপ্ত পানি পান না করা
- দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
- গর্ভাবস্থা
- অনিয়মিত জীবনযাপন
চিকিৎসকদের মতে, এসব কারণ দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে পাইলসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
অপারেশন ছাড়া কি পাইলস ভালো হয়?
ডা. রয় পাটানকরের মতে, প্রাথমিক বা মৃদু পর্যায়ের পাইলস অনেক সময় অপারেশন ছাড়াই ভালো হতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলে উপসর্গ কমে যায় এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।
যেসব অভ্যাস পাইলসের সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে—
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করা
- উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া
- ফলমূল ও শাকসবজি বেশি খাওয়া
- গোটা শস্যজাত খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা
- নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা
- মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অভ্যাস মলকে নরম রাখতে সাহায্য করে। ফলে মলত্যাগ সহজ হয় এবং মলদ্বারের শিরাগুলোর ওপর চাপ কম পড়ে।
ঘরোয়া উপায়ে কতটা উপকার পাওয়া যায়?
অনেকেই পাইলসের ব্যথা বা অস্বস্তি কমাতে বিভিন্ন ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করেন। এসব পদ্ধতি সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, তবে এগুলো চিকিৎসার বিকল্প নয়।
সাময়িক আরাম দিতে পারে যেসব উপায়—
- হালকা গরম পানিতে নিতম্ব ডুবিয়ে বসা
- কোল্ড কমপ্রেস বা বরফের সেঁক দেওয়া
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া
তবে উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা বাড়তে থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?
সব পাইলস একই ধরনের নয়। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলেও উপসর্গ পুরোপুরি দূর হয় না। তখন চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে—
- মলত্যাগের সময় নিয়মিত রক্তপাত হওয়া
- তীব্র ব্যথা অনুভব করা
- মলদ্বারে চাকা বা পিণ্ড তৈরি হওয়া
- ফোলাভাব দীর্ঘদিন না কমা
- দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যা হওয়া
চিকিৎসকদের মতে, এসব লক্ষণ রোগ জটিল হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে।
সবসময় পাইলস ভেবে ভুল করা ঠিক নয়
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, মলদ্বারে হওয়া সব সমস্যাকেই পাইলস বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। কিছু ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ অন্য গুরুতর রোগের কারণেও হতে পারে।
যেসব পরিস্থিতিতে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন—
- মলের সঙ্গে মিউকাস বা আম যাওয়া
- কখনও ডায়রিয়া, কখনও কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়া
- দীর্ঘদিন রক্তপাত চলতে থাকা
- পরিবারে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ইতিহাস থাকা
- বয়স বাড়ার সঙ্গে নতুন উপসর্গ দেখা দেওয়া
এ ধরনের ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে কোলনোস্কপিসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
পাইলস একটি সাধারণ কিন্তু অবহেলা করার মতো রোগ নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে অপারেশন ছাড়াই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে তীব্র ব্যথা, রক্তপাত বা দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত। দ্রুত চিকিৎসা নিলে জটিলতা কমে এবং রোগ থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।


























