রাজধানীর পূর্ব শেওড়াপাড়ায় চলন্ত মোটরসাইকেলে থাকা অবস্থায় মাথায় ছোড়া একটি ইটের আঘাতে গুরুতর আহত হওয়া ২১ বছর বয়সী সাজিদ চৌধুরী ওরফে রাফি ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত না-ফেরার দেশে চলে গেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউর সামনে প্রতিদিন অপেক্ষা করেছেন তাঁর মা তানিয়া সিকদার। কিন্তু প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক সংবাদে। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, একমাত্র সন্তান সাজিদ আর বেঁচে নেই।
২২ জুন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাজিদ। তাঁর মৃত্যুর পর শোকে ভেঙে পড়েছেন মা তানিয়া সিকদার। তিনি দাবি করেছেন, সম্পত্তিগত বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত দোষীদের বিচার দাবি করেছেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত ৯ জুন দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে। সেদিন ফুফুকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে মোটরসাইকেলে করে নিজ বাসায় ফিরছিলেন সাজিদ। রাজধানীর পূর্ব শেওড়াপাড়া এলাকায় পৌঁছানোর পর কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর ওপর হামলা চালায়। পুলিশের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, হামলাকারীরা আগে থেকেই ওত পেতে ছিল।
সাজিদ মোটরসাইকেল নিয়ে কাছে আসতেই তাঁর মাথা লক্ষ্য করে একটি ইট ছুড়ে মারা হয়। ইটের আঘাতে তিনি মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে পড়ে যান। মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
প্রথমদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা বলে প্রচারিত হলেও তদন্তে ভিন্ন তথ্য সামনে আসে। পুলিশ জানতে পারে, হামলাকারীদের সঙ্গে সাজিদের পূর্বপরিচয় ছিল। এরপর থেকেই ঘটনাটি পরিকল্পিত হামলা হিসেবে আলোচনায় আসে।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সাজিদের অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। মাথায় মারাত্মক আঘাতের কারণে তাঁর মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয় এবং দিনরাত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল।
এই পুরো সময়টাতে আইসিইউর সামনেই ছিলেন তাঁর মা তানিয়া সিকদার। তিনি বলেন, প্রতিটি মুহূর্তে আশা করতেন ছেলেটি সুস্থ হয়ে ফিরবে। কিন্তু ১৩ দিনের সেই অপেক্ষা শেষ হয় মৃত্যুসংবাদে। হাসপাতালের সিঁড়িতেই কাটিয়েছেন দিনের পর দিন।
তানিয়া সিকদার জানান, ঘটনার পর থেকে তিনি একাই সবকিছু সামলেছেন। ছেলের চিকিৎসার জন্য ওষুধ কিনেছেন, রক্ত সংগ্রহ করেছেন এবং চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে বিপুল ঋণও করেছেন। তারপরও শেষ পর্যন্ত সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি।
সন্তানের শেষ মুহূর্তের স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাত দুইটার দিকে চিকিৎসকরা আত্মীয়স্বজনকে খবর দিতে বলেন। পরে ভোরের দিকে জানানো হয় সাজিদের অবস্থা আরও খারাপ। সকাল ছয়টার দিকে চিকিৎসকরা তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।
তানিয়া সিকদারের জীবনসংগ্রামও কম নয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি জীবিকার তাগিদে বিদেশে কাজ করছেন। প্রায় এক দশক ধরে দুবাইয়ে চাকরি করলেও একমাত্র ছেলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। দেশে টাকা পাঠাতেন এবং ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন দেখতেন।
সাজিদের বাবা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন তানিয়া। প্রায় ১২ বছর আগে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর সাজিদ ঢাকায় বাবা ও চাচার সঙ্গে বসবাস করতেন। তবে মায়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
এবার ঈদুল আজহার ছুটিতে দেশে ফিরে ছেলের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন তানিয়া। একসঙ্গে কেনাকাটা করেছেন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছেন। সেই স্মৃতিগুলোই এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা ও বেদনার উৎস।
সাজিদের মৃত্যুর পর সম্পত্তি বিরোধকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তানিয়ার অভিযোগ, তাঁর সাবেক স্বামীর সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে সাজিদকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, পুরো বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাজিদের চাচা নুর হোসেন। তাঁর দাবি, শোকাহত মা হিসেবে তানিয়া আবেগ থেকে এসব কথা বলছেন। তিনি বলেন, ভাতিজাকে ছোটবেলা থেকে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করেছেন এবং তার ক্ষতি করার কোনো কারণ নেই।
নুর হোসেন আরও বলেন, তাঁদের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থাকলেও সেটি চাচাতো ভাইদের সঙ্গে, সাজিদের সঙ্গে নয়। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর বিরুদ্ধে যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর বাস্তব ভিত্তি নেই।
ঘটনার প্রকৃত কারণ কী এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা এখন তদন্তের বিষয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। তদন্তের অগ্রগতির দিকে তাকিয়ে আছে পরিবার ও সাধারণ মানুষ।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তানিয়া সিকদার এখন শুধু একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন—কেন তাঁর ছেলেকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো? একই সঙ্গে তিনি চান, দোষীরা যেন আইনের আওতায় আসে এবং সাজিদের মৃত্যুর সঠিক বিচার নিশ্চিত হয়।
রাজধানীতে প্রকাশ্যে এমন হামলার ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে এই মর্মান্তিক ঘটনা একজন মায়ের অসীম অপেক্ষা, সংগ্রাম এবং সন্তানের প্রতি ভালোবাসার এক হৃদয়বিদারক গল্প হয়ে উঠেছে।


























