ঢাকা ০৪:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo শেষ দেখায় জাপানের কাছে হার, এবার কি ঘুরে দাঁড়াবে ব্রাজিল? Logo বিশ্বকাপে শেষ ৩২ নিশ্চিত ১৯ দল, বিদায় ৮ দেশের Logo সুপারগার্ল সিনেমা মুক্তি | চার দশক পর ফিরেই ডিসির সবচেয়ে বড় চমক Logo ব্রাজিলকে হারানোর স্বপ্ন দেখছে জাপান, কী বললেন কোচ মরিয়াসু Logo মেসির গোল হলে ভিনির কেন নয়? ফিফায় ব্রাজিলের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ Logo বড় অঘটন: ৪ বারের বিশ্বকাপ জয়ী জার্মানিকে হারিয়ে নকআউটে ইকুয়েডর Logo সোনার আংটি উপহার: সরকারি হাসপাতালে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য বিজয়ের নতুন চমক Logo পবিত্র আশুরা আজ: রোজা-ইবাদতে দিনটি পালনের আহ্বান Logo মোদির নতুন চ্যালেঞ্জ ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন, ক্ষুব্ধ ভারতের তরুণরা Logo ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্প, নিহত ২৩৫—বাঁচার আকুতি এখনো

মোদির নতুন চ্যালেঞ্জ ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন, ক্ষুব্ধ ভারতের তরুণরা

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০১:১৯:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
  • ৫০৪

নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষা সংস্কার ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে কয়েক দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শত শত শিক্ষার্থী। নিজেদের ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ বলে পরিচয় দেওয়া এই তরুণদের আন্দোলন ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের সামনে তরুণদের অসন্তোষের অন্যতম বড় প্রকাশ।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে পরিচিত এই অরাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মূলত জেনারেশন জেড বা জেন-জি তরুণেরা। জুন মাসের তীব্র গরম উপেক্ষা করে গত শনিবার থেকে নয়াদিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন তারা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনের মূল দাবি হলো শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও সংস্কার নিশ্চিত করা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কলেজে ভর্তি পরীক্ষা, বোর্ড পরীক্ষা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে একের পর এক অব্যবস্থাপনা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। আন্দোলনকারীরা ধাতব থালা বাজিয়ে, জাতীয় সংগীত গেয়ে, ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার প্রদর্শন করে এবং দেশাত্মবোধক গানের সঙ্গে প্রতিবাদ জানিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। পুরো কর্মসূচিতে ছিল প্রতিবাদ ও প্রতীকি ব্যঙ্গের মিশ্রণ।

‘ককরোচ’ নামটি এসেছে আত্মব্যঙ্গের সংস্কৃতি থেকে। নিজেদের ছোট বা দুর্বল হিসেবে নয়, বরং প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকার প্রতীক হিসেবেই তারা এই পরিচয় গ্রহণ করেছে। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের আদলে ব্যঙ্গ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামটি রাখা হয়েছে।

আন্দোলনের পেছনে আরেকটি কারণ হলো ভারতের প্রধান বিচারপতির এক বিতর্কিত মন্তব্য। তরুণদের নিয়ে দেওয়া সেই মন্তব্যের প্রতিবাদ থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে বিচারপতি দাবি করেন, তাঁর বক্তব্য খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

মাত্র চার সপ্তাহের কম সময়ে সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ অনুসারী যুক্ত হয়েছে। এত অল্প সময়ে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের জন্য এটি বিরল ঘটনা। তবে অনলাইনের জনপ্রিয়তা বাস্তবের আন্দোলনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বয়স ১৮ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। তাদের অনেকেই বলছেন, তারা ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির পরিবর্তে কর্মসংস্থান, শিক্ষা সংস্কার ও উন্নয়ন চান। তরুণদের ভাষ্য, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের দায়বদ্ধতা থাকা উচিত।

৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তীব্র গরমের মধ্যেও অনেক শিক্ষার্থী হাতে পোস্টার নিয়ে আন্দোলনে অংশ নেন। একজন তরুণী বলেন, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা লাখো শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে তিনি আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। তাঁর মতে, তরুণদের একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর সময় এখনই।

সম্প্রতি বহুল আলোচিত নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং পরীক্ষা বাতিলের ঘটনায় ক্ষোভ আরও বাড়ে। সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে প্রায় ২৩ লাখ পরীক্ষার্থী অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। পরে আবারও পরীক্ষা নেওয়া হলেও অনেকের মতে, এতে ক্ষতি পূরণ হয়নি।

এদিকে স্কুল সমাপনী পরীক্ষার অনলাইন মূল্যায়ন ব্যবস্থাতেও গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একের পর এক প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় সরকার এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে।

প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সরকার জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রাম নিষিদ্ধ করে। পাশাপাশি পুনঃপরীক্ষায় বিমানবন্দরের মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা হয়। তবে আন্দোলনকারীদের মতে, এসব পদক্ষেপ অনেক দেরিতে নেওয়া হয়েছে।

গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, নিট পরীক্ষা বাতিল এবং পুনঃপরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে অন্তত ১২ জন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এই ঘটনাগুলো আন্দোলনকে আরও আবেগঘন করে তোলে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, এসব মৃত্যুর দায় সরকার এড়াতে পারে না।

বিক্ষোভে অনেক ইউটিউবার ও কনটেন্ট নির্মাতাকেও দেখা গেছে। কেউ কেউ আন্দোলনের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছেন। যদিও সমালোচকদের একাংশের মতে, কিছু মানুষ কেবল ভাইরাল হওয়ার উদ্দেশ্যেই সেখানে উপস্থিত হয়েছেন।

তবে রাতের বেলায় আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভস্থল খালি করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আন্দোলনকারীরা তখনও অবস্থান ধরে রাখেন। অনেকেই খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান।

আন্দোলনের নেতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ন্যায়বিচারের দাবিতে তাঁরা আন্দোলন করছেন। তাঁর দাবি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে এ ঘটনার দায় নিতে হবে। অন্যথায় আন্দোলন চলতেই থাকবে।

বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন দিপকে। দিল্লির পাশাপাশি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, নাগপুর ও জয়পুরেও তিনি বিক্ষোভ সংগঠিত করেন। কয়েকটি শহরে হামলারও শিকার হয়েছেন তিনি।

শনিবার রাতে পুলিশ বিক্ষোভস্থলের আলো নিভিয়ে দেয় এবং খাবার ও পানির প্রবেশে বাধা দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে অবশ্য পুলিশ পানি ও খাবার নিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেয়। পুলিশ জানিয়েছে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ না করার নির্দেশ রয়েছে।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর আন্দোলন শেষ হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে দিপকে বলেন, এটি কেবল একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের আন্দোলন নয়। শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

আন্দোলনের মুখপাত্র সৌরভ দাস সরকারের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার যদি সিজেপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসে, তাহলে সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে আন্দোলন কোন দিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ইশা শর্মা বলেন, আন্দোলনের পেছনে শক্তিশালী কোনো রাজনৈতিক কাঠামো নেই। তবুও ন্যায়বিচারের দাবিতে তারা রাজপথে নেমেছেন। তাঁর মতে, তরুণদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

হায়দরাবাদ থেকে আসা বিজয় রেড্ডি বলেন, তিনি রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এসেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষও আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। তাঁদের অনেকের সন্তান প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

ভারতের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। একই সময়ে কর্মসংস্থানের সংকট এবং বেকারত্বও বাড়ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে তা ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপির এই আন্দোলন কেবল শিক্ষা খাতের সংকট নয়, বরং তরুণ সমাজের দীর্ঘদিনের হতাশা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে সাম্প্রতিক তরুণনির্ভর আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ভারতেও নতুন ধরনের সামাজিক জাগরণের ইঙ্গিত দেখছেন অনেকে।

তবে ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হওয়ায় তাৎক্ষণিক কোনো বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তারপরও ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের বার্তা স্পষ্ট—তরুণদের দাবি ও ভবিষ্যৎকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করলে তার রাজনৈতিক মূল্য একসময় সরকারকেই দিতে হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

শেষ দেখায় জাপানের কাছে হার, এবার কি ঘুরে দাঁড়াবে ব্রাজিল?

মোদির নতুন চ্যালেঞ্জ ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন, ক্ষুব্ধ ভারতের তরুণরা

Update Time : ০১:১৯:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে কয়েক দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শত শত শিক্ষার্থী। নিজেদের ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ বলে পরিচয় দেওয়া এই তরুণদের আন্দোলন ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের সামনে তরুণদের অসন্তোষের অন্যতম বড় প্রকাশ।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে পরিচিত এই অরাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মূলত জেনারেশন জেড বা জেন-জি তরুণেরা। জুন মাসের তীব্র গরম উপেক্ষা করে গত শনিবার থেকে নয়াদিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন তারা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনের মূল দাবি হলো শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও সংস্কার নিশ্চিত করা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কলেজে ভর্তি পরীক্ষা, বোর্ড পরীক্ষা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে একের পর এক অব্যবস্থাপনা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। আন্দোলনকারীরা ধাতব থালা বাজিয়ে, জাতীয় সংগীত গেয়ে, ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার প্রদর্শন করে এবং দেশাত্মবোধক গানের সঙ্গে প্রতিবাদ জানিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। পুরো কর্মসূচিতে ছিল প্রতিবাদ ও প্রতীকি ব্যঙ্গের মিশ্রণ।

‘ককরোচ’ নামটি এসেছে আত্মব্যঙ্গের সংস্কৃতি থেকে। নিজেদের ছোট বা দুর্বল হিসেবে নয়, বরং প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকার প্রতীক হিসেবেই তারা এই পরিচয় গ্রহণ করেছে। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের আদলে ব্যঙ্গ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামটি রাখা হয়েছে।

আন্দোলনের পেছনে আরেকটি কারণ হলো ভারতের প্রধান বিচারপতির এক বিতর্কিত মন্তব্য। তরুণদের নিয়ে দেওয়া সেই মন্তব্যের প্রতিবাদ থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে বিচারপতি দাবি করেন, তাঁর বক্তব্য খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন  ইরানের প্রথম রাডার স্যাটেলাইট উদ্বোধন শিগগির, মহাকাশ কর্মসূচিতে নতুন অগ্রগতি

মাত্র চার সপ্তাহের কম সময়ে সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ অনুসারী যুক্ত হয়েছে। এত অল্প সময়ে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের জন্য এটি বিরল ঘটনা। তবে অনলাইনের জনপ্রিয়তা বাস্তবের আন্দোলনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বয়স ১৮ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। তাদের অনেকেই বলছেন, তারা ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির পরিবর্তে কর্মসংস্থান, শিক্ষা সংস্কার ও উন্নয়ন চান। তরুণদের ভাষ্য, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের দায়বদ্ধতা থাকা উচিত।

৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তীব্র গরমের মধ্যেও অনেক শিক্ষার্থী হাতে পোস্টার নিয়ে আন্দোলনে অংশ নেন। একজন তরুণী বলেন, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা লাখো শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে তিনি আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। তাঁর মতে, তরুণদের একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর সময় এখনই।

সম্প্রতি বহুল আলোচিত নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং পরীক্ষা বাতিলের ঘটনায় ক্ষোভ আরও বাড়ে। সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে প্রায় ২৩ লাখ পরীক্ষার্থী অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। পরে আবারও পরীক্ষা নেওয়া হলেও অনেকের মতে, এতে ক্ষতি পূরণ হয়নি।

এদিকে স্কুল সমাপনী পরীক্ষার অনলাইন মূল্যায়ন ব্যবস্থাতেও গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একের পর এক প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় সরকার এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে।

প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সরকার জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রাম নিষিদ্ধ করে। পাশাপাশি পুনঃপরীক্ষায় বিমানবন্দরের মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা হয়। তবে আন্দোলনকারীদের মতে, এসব পদক্ষেপ অনেক দেরিতে নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন  ইউরোপে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ: ১৮ মৃত্যু, ভাঙছে সব রেকর্ড

গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, নিট পরীক্ষা বাতিল এবং পুনঃপরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে অন্তত ১২ জন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এই ঘটনাগুলো আন্দোলনকে আরও আবেগঘন করে তোলে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, এসব মৃত্যুর দায় সরকার এড়াতে পারে না।

বিক্ষোভে অনেক ইউটিউবার ও কনটেন্ট নির্মাতাকেও দেখা গেছে। কেউ কেউ আন্দোলনের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছেন। যদিও সমালোচকদের একাংশের মতে, কিছু মানুষ কেবল ভাইরাল হওয়ার উদ্দেশ্যেই সেখানে উপস্থিত হয়েছেন।

তবে রাতের বেলায় আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভস্থল খালি করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আন্দোলনকারীরা তখনও অবস্থান ধরে রাখেন। অনেকেই খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান।

আন্দোলনের নেতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ন্যায়বিচারের দাবিতে তাঁরা আন্দোলন করছেন। তাঁর দাবি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে এ ঘটনার দায় নিতে হবে। অন্যথায় আন্দোলন চলতেই থাকবে।

বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন দিপকে। দিল্লির পাশাপাশি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, নাগপুর ও জয়পুরেও তিনি বিক্ষোভ সংগঠিত করেন। কয়েকটি শহরে হামলারও শিকার হয়েছেন তিনি।

শনিবার রাতে পুলিশ বিক্ষোভস্থলের আলো নিভিয়ে দেয় এবং খাবার ও পানির প্রবেশে বাধা দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে অবশ্য পুলিশ পানি ও খাবার নিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেয়। পুলিশ জানিয়েছে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ না করার নির্দেশ রয়েছে।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর আন্দোলন শেষ হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে দিপকে বলেন, এটি কেবল একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের আন্দোলন নয়। শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

আরও পড়ুন  হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে সম্মত ইরান!

আন্দোলনের মুখপাত্র সৌরভ দাস সরকারের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার যদি সিজেপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসে, তাহলে সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে আন্দোলন কোন দিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ইশা শর্মা বলেন, আন্দোলনের পেছনে শক্তিশালী কোনো রাজনৈতিক কাঠামো নেই। তবুও ন্যায়বিচারের দাবিতে তারা রাজপথে নেমেছেন। তাঁর মতে, তরুণদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

হায়দরাবাদ থেকে আসা বিজয় রেড্ডি বলেন, তিনি রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এসেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষও আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। তাঁদের অনেকের সন্তান প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

ভারতের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। একই সময়ে কর্মসংস্থানের সংকট এবং বেকারত্বও বাড়ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে তা ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপির এই আন্দোলন কেবল শিক্ষা খাতের সংকট নয়, বরং তরুণ সমাজের দীর্ঘদিনের হতাশা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে সাম্প্রতিক তরুণনির্ভর আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ভারতেও নতুন ধরনের সামাজিক জাগরণের ইঙ্গিত দেখছেন অনেকে।

তবে ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হওয়ায় তাৎক্ষণিক কোনো বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তারপরও ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের বার্তা স্পষ্ট—তরুণদের দাবি ও ভবিষ্যৎকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করলে তার রাজনৈতিক মূল্য একসময় সরকারকেই দিতে হতে পারে।