ঢাকা ০১:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানে ফের মার্কিন হামলা, পাল্টা আঘাতে বাড়ল যুদ্ধের আশঙ্কা

পানামার পতাকাবাহী জাহাজে হামলার পর ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে পানামার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনার জবাবে শনিবার এই অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে ইরানের ধারাবাহিক আগ্রাসনের জবাব হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, ইরান যুদ্ধবিরতির সুযোগ পেলেও পানামার পতাকাবাহী ট্যাংকার এমটি কিকুতে ড্রোন হামলা চালিয়ে সেই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, ড্রোন সংরক্ষণাগার, আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা এবং অন্যান্য কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়।

অন্যদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলীয় পাঁচটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। তারা এই হামলাকে আন্তর্জাতিক সমঝোতা লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা ও নৌপথ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ইরানের ওপরই রয়েছে। ভবিষ্যতে নিয়ম ভঙ্গকারী জাহাজের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।

আইআরজিসি আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ হলে শান্তি প্রতিষ্ঠার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।

ইরানের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যেকোনো বিদেশি আগ্রাসনের জবাব কঠোর ও বিধ্বংসী হবে। এমনকি ছোট আকারের হামলারও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে তেহরান। অপরদিকে সেন্টকম দাবি করেছে, তাদের সামরিক অভিযান কেবল প্রতিরক্ষামূলক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথ নিরাপদ রাখার উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হয়েছে।

হামলার পরপরই কুয়েত ও বাহরাইন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে। কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে। একই সময়ে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের শান্ত থাকার পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করার নির্দেশনা দেয়।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, তেহরান সম্ভবত কখনোই শিক্ষা নেবে না। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করতে বাধ্য হবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বর্তমান উত্তেজনার মূল কেন্দ্র হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান কার্যত এই পথের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৪ দফা সমঝোতার মাধ্যমে শত্রুতা কমানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। সেই চুক্তিতে ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় সেই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই নতুন সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে ফের মার্কিন হামলা, পাল্টা আঘাতে বাড়ল যুদ্ধের আশঙ্কা

Update Time : ০৯:১৪:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে পানামার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনার জবাবে শনিবার এই অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে ইরানের ধারাবাহিক আগ্রাসনের জবাব হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, ইরান যুদ্ধবিরতির সুযোগ পেলেও পানামার পতাকাবাহী ট্যাংকার এমটি কিকুতে ড্রোন হামলা চালিয়ে সেই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, ড্রোন সংরক্ষণাগার, আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা এবং অন্যান্য কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়।

অন্যদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলীয় পাঁচটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। তারা এই হামলাকে আন্তর্জাতিক সমঝোতা লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা ও নৌপথ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ইরানের ওপরই রয়েছে। ভবিষ্যতে নিয়ম ভঙ্গকারী জাহাজের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।

আরও পড়ুন  ভুল করে নিজ দেশেই বোমা ফেলেছে ইসরায়েলি হেলিকপ্টার

আইআরজিসি আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ হলে শান্তি প্রতিষ্ঠার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।

ইরানের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যেকোনো বিদেশি আগ্রাসনের জবাব কঠোর ও বিধ্বংসী হবে। এমনকি ছোট আকারের হামলারও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে তেহরান। অপরদিকে সেন্টকম দাবি করেছে, তাদের সামরিক অভিযান কেবল প্রতিরক্ষামূলক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথ নিরাপদ রাখার উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হয়েছে।

আরও পড়ুন  থালাপতি বিজয়ের শপথে নতুন ইতিহাস, তামিলনাড়ুতে জোট সরকার

হামলার পরপরই কুয়েত ও বাহরাইন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে। কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে। একই সময়ে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের শান্ত থাকার পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করার নির্দেশনা দেয়।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, তেহরান সম্ভবত কখনোই শিক্ষা নেবে না। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করতে বাধ্য হবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বর্তমান উত্তেজনার মূল কেন্দ্র হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান কার্যত এই পথের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

আরও পড়ুন  ইরান মিসাইল হামলা তথ্য

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৪ দফা সমঝোতার মাধ্যমে শত্রুতা কমানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। সেই চুক্তিতে ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় সেই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই নতুন সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।