ফুটবল বিশ্বকাপের ট্রফি বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া পুরস্কারগুলোর একটি। তবে অনেকেরই অজানা, বিশ্বকাপ জিতলেও কোনো দেশ স্থায়ীভাবে আসল ট্রফিটি নিজেদের কাছে রাখতে পারে না। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, চ্যাম্পিয়ন দলকে মূল ট্রফির পরিবর্তে সোনা-মোড়ানো ব্রাসের তৈরি একটি নিখুঁত রেপ্লিকা প্রদান করা হয়।
চার বছর পরপর বিশ্বের সেরা ৪৮টি দল এই ট্রফি জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামে। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর আবেগের কেন্দ্রবিন্দু এই ট্রফি শুধু একটি পুরস্কার নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ গৌরবের প্রতীক। তবে এই ট্রফির ইতিহাসে রয়েছে দুটি ভিন্ন অধ্যায়, যা ফুটবলের বিবর্তনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
জুলে রিমে ট্রফি: বিশ্বকাপের প্রথম স্বর্ণযুগ
১৯৩০ সালে প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলে বিজয়ী দলের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘জুলে রিমে ট্রফি’। ফিফার তৃতীয় সভাপতি জুল রিমের সম্মানে এই ট্রফির নামকরণ করা হয়। বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ।
ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্লুর ট্রফিটির নকশা তৈরি করেন। এটি পুরোপুরি খাঁটি সোনার ছিল না; রুপার ওপর সোনার প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। উচ্চতা ছিল ৩৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ছিল ৩.৮ কেজি।
এই ট্রফির নকশার অনুপ্রেরণা ছিল প্রাচীন গ্রিক পুরাণের বিজয়ের দেবী নাইকি। ট্রফিতে দেখা যেত, ডানাযুক্ত দেবী দুই হাতে একটি প্রাচীন পাত্র মাথার ওপরে তুলে ধরে আছেন। সেই সময় এটি ছিল ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতীক।
কেন ব্রাজিল স্থায়ীভাবে পেয়েছিল জুলে রিমে ট্রফি?
১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফিফার একটি বিশেষ নিয়ম ছিল। যে দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিততে পারবে, সেই দেশ স্থায়ীভাবে জুলে রিমে ট্রফির মালিক হবে।
১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইতালিকে হারিয়ে ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। পেলের নেতৃত্বে সেই ঐতিহাসিক জয়ের পর নিয়ম অনুযায়ী জুলে রিমে ট্রফিটি চিরতরে ব্রাজিলের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রথম যুগে ব্রাজিল তিনবার, ইতালি ও উরুগুয়ে দুইবার করে এবং জার্মানি ও ইংল্যান্ড একবার করে বিশ্বকাপ জিতেছিল। এরপরই ফিফাকে নতুন একটি ট্রফি তৈরির সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
আধুনিক ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির জন্ম
জুলে রিমে ট্রফি ব্রাজিলের কাছে চলে যাওয়ার পর নতুন ট্রফির নকশা তৈরির উদ্যোগ নেয় ফিফা। ১৯৭১ সালে ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগা বর্তমান বিশ্বকাপ ট্রফির নকশা তৈরি করেন।
ট্রফিটি তৈরি করে ইতালির বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান জিডিই বার্টোনি। এটি ১৮ ক্যারেট খাঁটি সোনা দিয়ে নির্মিত এবং বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত ক্রীড়া প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
নতুন ট্রফির নকশায় দেখা যায়, দুটি মানবমূর্তি পৃথিবীকে দুই হাত দিয়ে ওপরে তুলে ধরে রেখেছে। এই নকশা বিশ্ব ঐক্য, বিজয় এবং মানবতার প্রতীক হিসেবেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
আগের ট্রফির চেয়ে কী কী পরিবর্তন এসেছে?
আধুনিক ট্রফিটি আগের তুলনায় আকার ও ওজনে বড়। এর উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ৬.২ কেজি, যা জুলে রিমে ট্রফির তুলনায় অনেক ভারী।
১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবার এই নতুন ট্রফি বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন দল এই ট্রফি উঁচিয়ে ধরার গৌরব অর্জন করেছে।
সবশেষ কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এ আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি এই ট্রফি হাতে তুলে ধরেন। সেই মুহূর্ত বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য হয়ে আছে।
আধুনিক যুগে কোন দেশ কতবার বিশ্বকাপ জিতেছে?
১৯৭৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত আধুনিক ট্রফি যুগে জার্মানি ও আর্জেন্টিনা তিনবার করে বিশ্বকাপ জিতেছে। ইতালি, ব্রাজিল ও ফ্রান্স জিতেছে দুটি করে শিরোপা।
এছাড়া স্পেন ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে এই ট্রফি জয়ের তালিকায় নিজেদের নাম লেখায়। আধুনিক যুগে বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরই নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে।
তবে এত সাফল্যের পরও কোনো দেশ আসল ট্রফি স্থায়ীভাবে রাখতে পারে না। ফিফা মূল ট্রফিটি নিজেদের কাছেই সংরক্ষণ করে এবং চ্যাম্পিয়নদের হাতে তুলে দেয় সোনা-মোড়ানো একটি রেপ্লিকা।
ফুটবল ইতিহাসে ট্রফি বদলের গুরুত্ব
জুলে রিমে ট্রফি থেকে বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিতে রূপান্তর শুধুই একটি নকশার পরিবর্তন নয়। এটি বিশ্ব ফুটবলের বিকাশ, জনপ্রিয়তা এবং বৈশ্বিক মর্যাদার প্রতীক।
দেবী নাইকির ঐতিহ্যবাহী প্রতীক থেকে মানবজাতির হাতে পৃথিবী তুলে ধরার আধুনিক নকশা ফুটবলের পরিবর্তিত দর্শনকেও তুলে ধরে। প্রতিটি বিশ্বকাপের সঙ্গে এই ট্রফি নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ওঠে।
তাই চার বছর পরপর বিশ্বসেরা ফুটবলারদের স্বপ্ন থাকে একবার হলেও এই ট্রফি হাতে তোলার। কারণ ফুটবল বিশ্বকাপের ট্রফি আজও খেলাধুলার জগতে সর্বোচ্চ গৌরব, সম্মান এবং অর্জনের প্রতীক।















