টাইপ ২ ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায় না, এটি নীরবে লিভারেরও বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে বলে উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রতি চারজনের একজনের মধ্যে চিকিৎসাগতভাবে উল্লেখযোগ্য লিভার ফাইব্রোসিস রয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেকের লিভারে কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ না থাকলেও গুরুতর ক্ষতি ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তাই বিশেষজ্ঞরা এখন ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিয়মিত লিভার স্ক্রিনিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ডায়াবেটিসের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা বলতে সাধারণত হৃদরোগ, কিডনি বা চোখের সমস্যার কথাই বেশি আলোচনায় আসে। তবে নতুন গবেষণা বলছে, লিভারের রোগও এখন ডায়াবেটিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে The Lancet Regional Health – Southeast Asia জার্নালে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
ভারতজুড়ে পরিচালিত ‘ডায়াফিব-লিভার স্টাডি’-তে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৯ হাজার ২০০ জনেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল লিভার ফাইব্রোসিস বা লিভারে ক্ষত তৈরি হওয়ার প্রবণতা নির্ণয় করা।
গবেষণায় পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো হলো—
- প্রায় ২৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে চিকিৎসাগতভাবে উল্লেখযোগ্য লিভার ফাইব্রোসিস পাওয়া গেছে।
- ১৪ শতাংশ রোগীর মধ্যে অ্যাডভান্সড ফাইব্রোসিস ধরা পড়ে।
- প্রায় ৫ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে সিরোসিসের সম্ভাব্য লক্ষণ পাওয়া যায়, যদিও তাদের অনেকের কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছিল না।
- প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অংশগ্রহণকারীর লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে ছিল, যা বর্তমানে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (MASLD) নামে পরিচিত।
কেন বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ?
গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো—লিভারের ক্ষতি শুধু ফ্যাটি লিভারে আক্রান্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এমন অনেক রোগীও ছিলেন, যাদের লিভারে অতিরিক্ত চর্বি শনাক্ত হয়নি, তবুও তাদের লিভারে উল্লেখযোগ্য ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে।
এর অর্থ হলো, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের লিভারের ক্ষতি বছরের পর বছর নীরবে বাড়তে পারে এবং রোগটি অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই গুরুতর অবস্থায় পৌঁছে যেতে পারে।
ডায়াবেটিস কীভাবে লিভারের ক্ষতি করে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, টাইপ ২ ডায়াবেটিস ও লিভারের রোগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে এবং শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে গেলে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে।
এরপর ধীরে ধীরে যা ঘটে—
- লিভারে চর্বি জমে।
- প্রদাহ তৈরি হয়।
- লিভারের স্বাভাবিক টিস্যুর জায়গায় ক্ষত টিস্যু তৈরি হয়।
- একসময় লিভার ফাইব্রোসিস দেখা দেয়।
- চিকিৎসা না হলে তা সিরোসিস, লিভার ফেইলিওর কিংবা লিভার ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।
লিভারের ক্ষতি শনাক্ত করা যায় কীভাবে?
গবেষণায় ফাইব্রোস্ক্যান (FibroScan) নামের একটি আধুনিক, নন-ইনভেসিভ পরীক্ষা ব্যবহার করা হয়েছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে লিভারের দৃঢ়তা পরিমাপ করে ফাইব্রোসিস আছে কি না তা জানা যায়।
এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—
- বায়োপসি ছাড়াই পরীক্ষা করা সম্ভব।
- ব্যথাহীন ও দ্রুত সম্পন্ন হয়।
- লিভারের ক্ষতি প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা যায়।
- সময়মতো চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়।
গবেষকদের মতে, ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত ফাইব্রোস্ক্যানের মতো স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে গুরুতর লিভারের রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
যাদের বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন
নিচের বৈশিষ্ট্য থাকলে লিভারের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে—
- দীর্ঘদিনের টাইপ ২ ডায়াবেটিস।
- স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন।
- রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকা।
- উচ্চ কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইড।
- উচ্চ রক্তচাপ।
- শারীরিক পরিশ্রমের অভাব।
ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—
- নিয়মিত রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- ওজন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন।
- প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন।
- অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খান।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত লিভারের পরীক্ষা করান।
- অ্যালকোহল সেবন থেকে বিরত থাকুন এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন।
ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করার সমস্যা নয়; এটি লিভারের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। নতুন গবেষণা বলছে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেকের লিভারের ক্ষতি দীর্ঘদিন অজান্তেই থেকে যায়। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়মিত লিভার পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই ভবিষ্যতের গুরুতর জটিলতা এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।





























