রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন খুচরা বাজারে মাত্র তিন থেকে চার দিনের ব্যবধানে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে আলু, কাঁচা মরিচ, বেগুন এবং কয়েক ধরনের চালের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ কমে যাওয়ায় এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহের শুরুতে যে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, এখন সেটির দাম বেড়ে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় পৌঁছেছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
শুধু ব্রয়লার নয়, সোনালি মুরগির দামও একই হারে বেড়েছে। গত সপ্তাহে প্রতি কেজি সোনালি মুরগি ২৮০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে যারা নিয়মিত সোনালি মুরগি কিনতেন, তাদেরও এখন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বিক্রেতাদের ভাষ্য, খামার পর্যায়ে মুরগির উৎপাদন কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে দাম বেড়েছে। সেই প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজারেও পড়েছে। ফলে বিক্রেতাদেরও বেশি দামে মুরগি কিনে বিক্রি করতে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের এক মুরগি বিক্রেতা জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও তীব্র গরমের কারণে অনেক খামারি নতুন করে ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা তুলতে পারেননি। আবার অনেকেই লোকসানের আশঙ্কায় নির্ধারিত সময়ের আগেই মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত তাপমাত্রা মুরগি পালনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। বিদ্যুৎ সমস্যা থাকলে খামারে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
মুরগির পাশাপাশি আলুর দামও বেড়েছে। এক মাস আগে প্রতি কেজি আলু ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ এক মাসে আলুর দাম প্রায় ২২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশি রসুনের দামও গত এক মাসে বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি কেজি দেশি রসুন ৯০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে একই রসুনের দাম ছিল ৬০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে।
চালের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। নাজিরশাইল ও মিনিকেটের মতো সরু চালের দাম প্রতি কেজিতে প্রায় ২ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে এসব চাল ৭২ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মাঝারি মানের পাইজাম ও ব্রি-২৮ চালের দামও কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে মোটা চালের দামও কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সব ধরনের চালের বাজারেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চিনিগুঁড়া বা পোলাওয়ের চালের দাম। এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা বেড়ে বর্তমানে খোলা পোলাওয়ের চাল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সামনে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান থাকায় এই চালের চাহিদাও বেশি রয়েছে।
সবজির বাজারে মিশ্র চিত্র দেখা গেলেও কাঁচা মরিচ ও বেগুনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে একই মরিচের দাম প্রায় ২০ টাকা কম ছিল।
একইভাবে বেগুনের দামও কেজিতে প্রায় ২০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে বেগুন ৭০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা বলছেন, কয়েক দিনের ব্যবধানে এত বেশি দাম বৃদ্ধি তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবজি বিক্রেতাদের দাবি, চলতি সপ্তাহে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকা থেকে পর্যাপ্ত সবজি বাজারে আসেনি। ফলে কাঁচা মরিচ ও বেগুনের সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়েছে।
তবে বিক্রেতারা আশা করছেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে এবং সরবরাহ বাড়লে সবজির দাম আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। কৃষিপণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে বাজারেও স্থিতিশীলতা ফিরবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে মাসিক পারিবারিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
ক্রেতারা বলছেন, একের পর এক নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজারে গেলে আগের তুলনায় একই পরিমাণ পণ্য কিনতে এখন অনেক বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার করা গেলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগি, আলু, চাল এবং কিছু সবজির দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। আগামী দিনগুলোতে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাজারে মূল্য কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।




























