সামাজিক যোগাযোগের পাশাপাশি ইসলামি জ্ঞানচর্চা, চাকরি, শিক্ষা ও ব্যবসা- সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের প্রয়োজন কমাতে চায় আলফাফা। ইসলামি মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটির দাবি, বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশের ব্যবহারকারীরা এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ থেকে শুরু করে ই-কমার্স পর্যন্ত নানা সেবা এক জায়গায় আনার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
আলফাফার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গুগল প্লে স্টোর ও অ্যাপল অ্যাপ স্টোর মিলিয়ে অ্যাপটি তিন মিলিয়নেরও বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে। প্রতি মাসে ৭০ হাজারের বেশি সক্রিয় ব্যবহারকারী প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করেন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার বাড়ছে বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ইসলামি মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে যাত্রা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন নানা ধরনের তথ্য, ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এসব কনটেন্টের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় এড়িয়ে চলা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অনলাইনে যুক্ত থাকার সুযোগ তৈরি করাই আলফাফার অন্যতম লক্ষ্য।
প্ল্যাটফর্মটির কর্তৃপক্ষের দাবি, এখানে অশ্লীলতা, ফিতনা ও ইসলামবিরোধী কনটেন্ট ঠেকাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাদের উদ্দেশ্য এমন একটি অনলাইন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মুসলিম ব্যবহারকারীরা সামাজিক যোগাযোগের পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, দাওয়াহ ও পেশাগত কার্যক্রম চালাতে পারবেন।
তবে প্ল্যাটফর্মটির কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা ও ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে স্বাধীন মূল্যায়নের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
‘ডিজিটাল উম্মাহ’ গড়ার পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কয়েকজন ইসলামপ্রিয় তরুণের উদ্যোগে আলফাফার যাত্রা শুরু হয়। বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ডিজিটাল পরিসর গড়ে তোলাই ছিল তাঁদের লক্ষ্য।
আলফাফার নির্বাহী পরিচালক আসিফ সাঈদ গণমাধ্যমকে বলেন, মূলধারার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক মুসলিমের পক্ষে নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলা কঠিন হতে পারে। সেই প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ইসলামি আদর্শভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে সংযোগ বাড়িয়ে একটি ‘ডিজিটাল উম্মাহ’ তৈরি করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
সামাজিক যোগাযোগের বাইরেও যেসব সুবিধা
আলফাফায় সাধারণ পোস্ট, ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পাশাপাশি ব্লগ এবং ফোরামে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষা ও পেশাগত ক্ষেত্রেও ব্যবহারকারীদের যুক্ত করতে প্ল্যাটফর্মটিতে চাকরি খোঁজা, শিক্ষাদান এবং ই-কমার্সের মতো সুবিধা রাখা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবহারকারীরা নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, হালাল রেস্তোরাঁ, চাকরি কিংবা পেশাগত পরিচিতি বিনামূল্যে তালিকাভুক্ত করতে পারেন। এতে স্থানীয় ব্যবসা ও সেবার তথ্য খুঁজে পাওয়া এবং পেশাগত যোগাযোগ তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্ল্যাটফর্মটিতে অনুদান দেওয়ার সুবিধা ও ই-ওয়ালেটও যুক্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এসব আর্থিক সেবার ব্যবহার, লেনদেনের শর্ত ও প্রাপ্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ব্যবহারের আগে যাচাই করা প্রয়োজন।
কোর্স, রিলস ও ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা
আলফাফার দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্ল্যাটফর্মটির বিভিন্ন কোর্সে সাত হাজার শিক্ষার্থী যুক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি এতে ২২ হাজারের বেশি রিলস প্রকাশিত হয়েছে।
ইসলামি জ্ঞানচর্চার জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে কোরআন তিলাওয়াত, হাদিস এবং বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়ভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করা হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
শিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়নের পরিসর আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ভবিষ্যতে বই কেনাবেচার জন্য আলাদা বাজার চালু এবং প্ল্যাটফর্মের ভেতরে বই পড়ার সুবিধা যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
কম ডেটায় ব্যবহারের উদ্যোগ
সীমিত ইন্টারনেট সুবিধা থাকা ব্যবহারকারীদের কথা মাথায় রেখে ‘Alfafaa Connect’ নামে একটি লাইট সংস্করণ চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি এই সংস্করণের লক্ষ্য কম ডেটা খরচে দ্রুত সেবা দেওয়া। পাশাপাশি নতুন আরেকটি অ্যাপ চালুর প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
আলফাফা ব্যবহার করতে আগ্রহীরা গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে ‘Alfafaa’ লিখে অনুসন্ধান করে অ্যাপটির পরিচয় ও প্রকাশক যাচাই করতে পারেন।
ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ব্যবহারকারীদের আস্থায়
সামাজিক যোগাযোগ, ইসলামি শিক্ষা, দাওয়াহ, চাকরি ও ব্যবসাকে একই ডিজিটাল পরিসরে আনার উদ্যোগ আলফাফাকে একটি বহুমুখী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরছে। বিশেষ করে ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনলাইন পরিবেশ খুঁজছেন- এমন ব্যবহারকারীদের কাছে এটি আগ্রহের বিষয় হতে পারে।
তবে শুধু ব্যবহারকারীর সংখ্যা বা ডাউনলোড বাড়লেই একটি প্ল্যাটফর্মের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিশ্চিত হয় না। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, কনটেন্ট যাচাই, সেবার নির্ভরযোগ্যতা এবং আর্থিক সুবিধার স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের এক জায়গায় যুক্ত করার যে লক্ষ্য নিয়ে আলফাফার যাত্রা, তা কতটা সফল হবে সেটি নির্ভর করবে ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জন এবং প্রতিশ্রুত সুবিধাগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনার ওপর।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন