মাথাব্যথা হলেই সেটিকে সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। কারণ, মাইগ্রেনের ব্যথা দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত করার পাশাপাশি আলো, শব্দ ও গন্ধের প্রতি সংবেদনশীলতা তৈরি করতে পারে। কারও ক্ষেত্রে মাথার এক পাশে, আবার কারও ক্ষেত্রে দুই পাশেই ব্যথা হয়। সঙ্গে বমি বমি ভাব বা বমিও হতে পারে।

মাইগ্রেনের ব্যথা কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে কিছু অভ্যাস ব্যথার সময় অস্বস্তি কমাতে এবং ভবিষ্যতে আক্রমণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত ঘুম, ঠান্ডা সেঁক এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মতো পদ্ধতি চেষ্টা করা যায়। জেনে নিন মাইগ্রেনের ব্যথা কমাতে সহায়ক ১১টি ঘরোয়া উপায়।

১. পর্যাপ্ত পানি পান করুন

পানিশূন্যতা কিছু মানুষের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। তাই সারা দিন নিয়মিত পানি পান করুন। মাইগ্রেনের সময় বমি হলে শরীরে পানির ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। বয়স, আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ভিত্তিতে পানির চাহিদা ভিন্ন হয়।

২. মাথায় ঠান্ডা সেঁক দিন

মাইগ্রেনের ব্যথার সময় কপাল বা মাথায় কাপড়ে মোড়ানো ঠান্ডা প্যাক ব্যবহার করে দেখতে পারেন। এতে কারও কারও ব্যথা ও অস্বস্তি সাময়িকভাবে কমতে পারে। তবে বরফ সরাসরি ত্বকে লাগাবেন না এবং একটানা দীর্ঘ সময় ঠান্ডা প্যাক ব্যবহার করবেন না।

৩. অন্ধকার ও শান্ত ঘরে বিশ্রাম নিন

আলো ও শব্দ মাইগ্রেনের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। ব্যথা শুরু হলে কম আলো ও কম শব্দযুক্ত ঘরে বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে কিছু সময় মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও টেলিভিশনের পর্দা থেকে দূরে থাকুন।

৪. ঘুমের সময় নির্দিষ্ট রাখুন

ঘুম কম হওয়া কিংবা ঘুমের সময়সূচিতে বড় পরিবর্তন মাইগ্রেনের আক্রমণ উসকে দিতে পারে। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন। পর্যাপ্ত ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতেও সাহায্য করে।

৫. খাবার বা পানীয়তে আদা রাখতে পারেন

আদা বমি বমি ভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে। কিছু গবেষণায় মাইগ্রেনের ব্যথা ও এর সঙ্গে থাকা বমি বমি ভাব কমানোর সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে আদা মাইগ্রেনের নিশ্চিত চিকিৎসা নয়। খাবার বা পানীয়ের সঙ্গে পরিমিত পরিমাণে আদা গ্রহণ করতে পারেন।

৬. পেপারমিন্ট তেল ব্যবহারে সতর্ক থাকুন

পেপারমিন্ট তেলে থাকা মেনথল ত্বকে ঠান্ডা অনুভূতি তৈরি করতে পারে। তবে মাইগ্রেনের ব্যথা কমাতে এর কার্যকারিতার প্রমাণ সীমিত। ব্যবহার করতে চাইলে আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন। তেল চোখে বা সংবেদনশীল ত্বকে লাগাবেন না। জ্বালাপোড়া বা অ্যালার্জি হলে ব্যবহার বন্ধ করুন।

৭. মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন

মানসিক চাপ অনেকের মাইগ্রেনের সম্ভাব্য উদ্দীপক। নিয়মিত গভীর শ্বাসের ব্যায়াম, ধ্যান, হালকা যোগব্যায়াম কিংবা পছন্দের শান্ত কোনো কাজে সময় দেওয়া চাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

মাইগ্রেনের আক্রমণের মধ্যবর্তী সময়ে নিয়মিত হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়ামও উপকারী হতে পারে। তবে ব্যথা তীব্র থাকলে জোর করে ব্যায়াম না করে বিশ্রাম নিন।

৮. কোন খাবারে সমস্যা বাড়ে, তা খেয়াল করুন

সব মানুষের মাইগ্রেনের উদ্দীপক এক নয়। কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, নির্দিষ্ট খাবার কিংবা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে মাথাব্যথার সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই নিজের অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করুন। প্রমাণ ছাড়া অনেক ধরনের খাবার একসঙ্গে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

৯. ক্যাফেইন গ্রহণে ভারসাম্য রাখুন

চা, কফি ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় কিছু মানুষের মাথাব্যথায় সাময়িক আরাম দিতে পারে। আবার অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ বা নিয়মিত গ্রহণের পর হঠাৎ বন্ধ করে দিলেও মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে। তাই নিজের প্রতিক্রিয়া বুঝে ক্যাফেইন গ্রহণ করুন। বেশি পরিমাণে পান করার অভ্যাস থাকলে ধীরে ধীরে কমানো ভালো।

১০. ম্যাগনেশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খান

বাদাম, বীজ, ডাল, গোটা শস্য ও সবুজ শাকসবজিতে ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া যায়। কিছু গবেষণায় মাইগ্রেন প্রতিরোধে এই খনিজের সম্ভাব্য ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। তবে খাবার থেকে ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া এবং উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ এক বিষয় নয়। সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, বিশেষ করে কিডনির সমস্যা থাকলে।

১১. মাইগ্রেনের ডায়েরি রাখুন

কখন মাথাব্যথা শুরু হচ্ছে, কতক্ষণ থাকছে, ব্যথার তীব্রতা কেমন এবং এর আগে কী খেয়েছেন বা কতক্ষণ ঘুমিয়েছেন এসব লিখে রাখুন। মানসিক চাপ, মাসিকের সময় এবং ব্যথা কমাতে কী করেছেন, সেগুলোও নোট করতে পারেন।

এভাবে তথ্য সংরক্ষণ করলে কোন পরিস্থিতিতে মাইগ্রেন বাড়ে তা বুঝতে সুবিধা হয়। চিকিৎসকের কাছে গেলে এই ডায়েরি রোগের ধরন নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনা করতেও সহায়ক হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন

ঘরোয়া যত্নে কিছুটা আরাম পাওয়া গেলেও বারবার মাইগ্রেন হলে, ব্যথা বাড়তে থাকলে বা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক মাইগ্রেনের আক্রমণ কমানোর ওষুধ বা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন।

হঠাৎ অত্যন্ত তীব্র মাথাব্যথা শুরু হলে, অথবা মাথাব্যথার সঙ্গে শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, জ্বর ও ঘাড় শক্ত হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিন।

মনে রাখবেন, ঘরোয়া উপায় মাইগ্রেনের উপসর্গ সামলাতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু এগুলো চিকিৎসার বিকল্প নয়। নিয়মিত বা তীব্র মাইগ্রেন হলে সঠিক রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।