প্রতিদিনের খাবারে ভাত থাকলেও কোন ধরনের চাল স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপযোগী, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে। বাজারে মোটা ও চিকন- দুই ধরনের চালই পাওয়া যায়। কেউ স্বাদ ও রান্নার সুবিধার জন্য চিকন চাল পছন্দ করেন, আবার কেউ মোটা চাল বেছে নেন। তবে শুধু চালের দানার আকার নয়, সেটি কতটা পরিশোধিত এবং এতে কী পরিমাণ আঁশ রয়েছে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
মোটা নাকি চিকন চাল- কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর, তার উত্তর নির্ভর করে চালের ধরন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর। সাধারণভাবে কম পরিশোধিত ও আঁশসমৃদ্ধ চাল খাদ্যতালিকায় বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। তবে সব মোটা চালেই যে বেশি ফাইবার থাকে বা সব চিকন চালই কম পুষ্টিকর, এমন নয়।
চাল যত বেশি পরিশোধিত, পুষ্টির পরিবর্তন তত বেশি
ধানের বাইরের স্তর ও ভ্রূণে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে। চালকে অতিরিক্ত পরিশোধন করে সাদা ও চকচকে করার সময় এসব স্তরের অনেকটাই বাদ পড়ে যায়। ফলে চালের আঁশ, কিছু বি-ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের পরিমাণ কমতে পারে।
অন্যদিকে, কম পরিশোধিত চাল বা বাদামি চালে বাইরের আঁশযুক্ত স্তরের বেশি অংশ অক্ষত থাকে। এ কারণে একই পরিমাণে কিছু ধরনের বাদামি চাল সাদা চালের তুলনায় বেশি ফাইবার সরবরাহ করতে পারে। তবে চালের রং কিংবা দানার আকার দেখেই এর পুষ্টিমান পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায় না।
মোটা চালে কি সত্যিই ফাইবার বেশি?
মোটা চালের দানা বড় হলেই যে তাতে বেশি আঁশ থাকবে, তা নয়। ফাইবারের পরিমাণ মূলত নির্ভর করে চালের জাত এবং কতটা প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে তার ওপর। কিছু মোটা চাল কম পরিশোধিত হতে পারে, আবার কিছু চিকন চালও পুষ্টিগুণের দিক থেকে ভালো হতে পারে।
আঁশসমৃদ্ধ খাবার হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি দিতে পারে। তাই চাল বাছাইয়ের সময় শুধু দানার আকার না দেখে চালের ধরন ও পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কোন চাল উপযোগী?
ডায়াবেটিস রয়েছে এমন ব্যক্তিদের জন্য খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সাদা চালের কিছু ধরন দ্রুত হজম হয়ে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা তুলনামূলক দ্রুত বাড়াতে পারে। তবে এই প্রভাব চালের জাত, রান্নার পদ্ধতি, খাওয়ার পরিমাণ এবং খাবারের সঙ্গে অন্য কী রয়েছে- এসবের ওপরও নির্ভর করে।
কম পরিশোধিত ও আঁশসমৃদ্ধ চাল কিছু ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু চাল বদলালেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে, এমন নয়। ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাও জরুরি।
ওজন কমাতে কোন চাল খাওয়া ভালো?
ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকা এবং মোট ক্যালরি গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আঁশসমৃদ্ধ খাবার তৃপ্তি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। ফলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমানো সহজ হয়।
তবে মোটা চাল খেলেই ওজন কমবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। চালের ধরন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কতটুকু ভাত খাওয়া হচ্ছে, সঙ্গে কী ধরনের খাবার রয়েছে এবং সারাদিনে কতটা শারীরিক পরিশ্রম হচ্ছে, সেগুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। ওজন কমানোর লক্ষ্য থাকলে ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শাকসবজি, ডাল ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা ভালো।
হৃদ্স্বাস্থ্যে আঁশের ভূমিকা
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে পর্যাপ্ত ফাইবার থাকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দ্রবণীয় আঁশ রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে সব ধরনের চালেই একই পরিমাণ বা একই ধরনের আঁশ থাকে না।
হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধু চালের ওপর নির্ভর না করে পুরো খাদ্যতালিকায় নজর দেওয়া প্রয়োজন। শাকসবজি, ফল, ডাল, বাদাম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত খাওয়া এবং অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
কারা চাল বাছাইয়ে বাড়তি সতর্ক থাকবেন?
ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন বা হৃদ্রোগের ঝুঁকি রয়েছে এমন ব্যক্তিরা চালের ধরন ও ভাতের পরিমাণ নিয়ে সচেতন থাকতে পারেন। তাঁদের জন্য কম পরিশোধিত ও আঁশসমৃদ্ধ চাল উপযোগী হতে পারে। তবে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, ওষুধ এবং অন্যান্য খাদ্যচাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে। তাই প্রয়োজনে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
অন্যদিকে, যাঁদের হজমের সমস্যা রয়েছে বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সহজপাচ্য খাবার খেতে হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে খাবার নির্বাচনের নিয়ম আলাদা হতে পারে। শুধু মোটা বা চিকন চালের ভিত্তিতে কোনো খাবারকে সবার জন্য ভালো কিংবা খারাপ বলা ঠিক নয়।
শুধু চাল নয়, ভাতের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ
স্বাস্থ্যকর চাল বেছে নেওয়ার পাশাপাশি একবারে কতটুকু ভাত খাওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ভাত খেলে মোট ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে। তাই ব্যক্তির চাহিদা অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক করা প্রয়োজন।
ভাতের সঙ্গে শাকসবজি, ডাল, মাছ, ডিম বা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখলে খাবারে পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয়। একই সঙ্গে নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতায় সহায়তা করে।
সব মিলিয়ে, মোটা চাল নাকি চিকন চাল- কোনটি ভালো, তা শুধু দানার আকার দেখে নির্ধারণ করা যায় না। সাধারণভাবে কম পরিশোধিত ও বেশি আঁশযুক্ত চাল খাদ্যাভ্যাসে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। তবে চালের জাত, প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাওয়ার পরিমাণ এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্য বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন