বাংলাদেশের রেল যোগাযোগে বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে দেশের প্রথম ইলেকট্রিক ট্রেন প্রকল্প। নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুরের ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে বর্তমানের তুলনায় যাত্রার সময় অর্ধেকেরও বেশি কমতে পারে। প্রায় ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্পটি আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য তোলার কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে এটি হবে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রকল্প।
প্রকল্পটির নাম ‘ইমপ্লিমেন্টেশন অব ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন অ্যালং নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর সেকশন অব বাংলাদেশ রেলওয়ে’। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদ্যমান রেললাইনের ওপর ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা বসিয়ে বিদ্যুতের মাধ্যমে ট্রেন চালানো হবে। একই সঙ্গে কেনা হবে পাঁচ কোচের ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট বা ইএমইউ ট্রেন। এসব ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা একটি ইএমইউ কারখানাও নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ের মধ্যে সরকার দেবে ৯৪২ কোটি ৯ লাখ টাকা। বাকি ২ হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে একনেকের অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পরই প্রকল্পের বাস্তব কাজ এগোবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের হিসাবে, বর্তমান ডিজেল-ইলেকট্রিক ব্যবস্থার তুলনায় বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি জ্বালানিসাশ্রয়ী হতে পারে। বৈদ্যুতিক ট্রেন দ্রুত গতি বাড়াতে ও কমাতে পারে বলে ঘন ঘন স্টেশনে থামলেও সময়ের অপচয় তুলনামূলক কম হয়। প্রকল্প প্রস্তাবে গড় গতি প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। এর ফলে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত পুরো যাত্রার সময় অর্ধেকের বেশি কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
শুধু গতি নয়, নতুন ব্যবস্থায় যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতাও কয়েক গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্যে এই করিডোরে দৈনিক যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি করার লক্ষ্য জানানো হয়েছিল। দৈনিক ট্রেন সার্ভিস ৬৫টি থেকে ২৩৫টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ব্যস্ত সময়ে প্রায় ১৫ মিনিট পরপর ট্রেন চালানো সম্ভব হলে যাত্রীদের অপেক্ষার সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই দুই এলাকা থেকে ঢাকায় যাতায়াত করেন। বর্তমানে সড়কে দীর্ঘ যানজট এবং রেলে সীমিত ট্রেনের কারণে কর্মজীবী মানুষের বড় সময় নষ্ট হয়। দ্রুত ও ঘন ঘন ইলেকট্রিক ট্রেন চললে সড়কের ওপর যাত্রীচাপ কমার পাশাপাশি রেলের প্রতি মানুষের নির্ভরতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ডিজেলের ব্যবহার কমায় বায়ুদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমানোরও সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এখনই ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর নির্দিষ্ট তারিখ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ প্রকল্পটি এখনো অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। একনেকের অনুমোদনের পর অর্থায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা স্থাপন এবং নতুন ট্রেন সংগ্রহসহ বেশ কয়েকটি ধাপ শেষ করতে হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের প্রথম ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর পথ তৈরি হতে পারে। বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর করিডোরে এটি বাংলাদেশের দৈনন্দিন রেলযাত্রার চিত্রই বদলে দিতে পারে।




























