ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দূষণমুক্ত নদী, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও বাসযোগ্য নগরী রেখে যেতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, নদী রক্ষা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; নদী ও পরিবেশ রক্ষায় নাগরিকদেরও সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে রাজধানীর চারপাশের নদ-নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আয়োজিত এক পর্যালোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সভায় ঢাকার চারপাশের গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদী এবং এসব নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও ড্রেনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য অপসারণ, নদী সংরক্ষণ, নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হয়।
সভায় রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোর দূষণ কমাতে এ পর্যন্ত নেওয়া পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
রাজধানীর আশপাশের নদীগুলোতে শিল্পকারখানার বর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধরনের দূষিত পানি প্রবেশের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশগত সমস্যা তৈরি হয়েছে। নদীর পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি অনেক জায়গায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ অবস্থায় শুধু নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ না করে যেসব উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সভায়।
রাজধানীর নদ-নদীর দূষণের সঙ্গে খাল ও ড্রেনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন এলাকার বর্জ্য ও দূষিত পানি খাল ও ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে গিয়ে পড়ায় নদীর পানি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সভায় এসব খাল ও ড্রেনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নদীতে যাতে অপরিশোধিত বর্জ্য বা দূষিত পানি সরাসরি না যায়, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোর নাব্যতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পায়। পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় অনেক স্থানে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেছে। এতে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি নৌপথে চলাচলেও সমস্যা তৈরি হয়।
নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন অনুযায়ী খনন, নদীর তীর সংরক্ষণ এবং দখল ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার নৌপথের উন্নয়ন নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। রাজধানীর ওপর সড়ক যোগাযোগের চাপ কমাতে নৌপথকে কার্যকর ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।
বৃত্তাকার নৌপথ উন্নত হলে রাজধানী ও আশপাশের এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও নৌপথের ব্যবহার বাড়তে পারে। তবে এর জন্য নদীর নাব্যতা, নৌযানের নিরাপদ চলাচল, ঘাট ব্যবস্থাপনা ও নদী তীরের অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ রক্ষা ও নদী সংরক্ষণে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। নাগরিকদের নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নদীকে বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত না করে এর স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রবাহ ধরে রাখতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
নদীর তীরে ময়লা-আবর্জনা না ফেলা, খাল ও ড্রেনে বর্জ্য না দেওয়া এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধনের মাধ্যমে নিষ্কাশনের বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাজধানীর চারপাশের নদী ও জলাশয় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে একাধিক মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, প্রশাসন এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থা জড়িত। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকলে নদী রক্ষার উদ্যোগ কার্যকর করা কঠিন।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোকে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে নির্ধারিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কমান্ডার (ঢাকা নৌ অঞ্চল) রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ-আল-মাকসুস সভায় অংশ নেন।
সভায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় রাজধানীর নদ-নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদী সংরক্ষণ, নাব্যতা নিশ্চিতকরণ এবং বৃত্তাকার নৌপথ উন্নয়নের বিষয়ে বিভিন্ন সুপারিশ ও করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।

























