বলিউডের পর্দায় কখনো মমতাময়ী মা, কখনো আদরের বোন, আবার কখনো দিদিমা এই সব চরিত্রেই দর্শকদের মন জয় করেছেন ফরিদা জালাল। ছয় দশকের ক্যারিয়ারে তিনি প্রমাণ করেছেন, পার্শ্বচরিত্র দিয়েও কিংবদন্তি হওয়া যায়। নায়ক-নায়িকার ভিড়েও তিনি ছিলেন আলাদা।
নিজের সীমারেখায় অটল
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নিজের জন্য একটি সীমারেখা ঠিক করে নিয়েছিলেন তিনি। বড় বড় সুযোগ এলেও কখনো সেই সীমা অতিক্রম করেননি। সম্মান বজায় রেখে কাজ করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “সম্মান ধরে রেখে কাজ করতে চেয়েছি। সময়ের সঙ্গে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
নায়িকা হওয়ার ইচ্ছা কেন ছিল না?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে ক্যারিয়ারের শুরুতে কি কখনো নায়িকা হওয়ার ইচ্ছে হয়নি ফরিদা জালাল–এর? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি সবসময়ই দিয়েছেন খুব বাস্তব ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা। তাঁর মতে, সেই সময়ের চলচ্চিত্রে নায়িকাদের চরিত্র বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিল নির্দিষ্ট এক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
তিনি জানান, নায়িকাদের ভূমিকা তখন মূলত গান, নাচ আর কিছু নির্দিষ্ট দৃশ্যের মধ্যেই আটকে থাকত। অভিনয়ের গভীরতা বা চরিত্রের ভেতরের আবেগ প্রকাশের সুযোগ খুব একটা থাকত না। ফলে একজন শিল্পী হিসেবে নিজের পুরোটা দেখানোর সুযোগ সেখানে সীমিত ছিল বলেই মনে করতেন তিনি।
এই ধরনের চরিত্র তাঁর কাছে খুব একটা চ্যালেঞ্জিং বা আকর্ষণীয় মনে হয়নি। বরং তিনি এমন চরিত্র খুঁজতেন, যেখানে নিজের অভিনয় দক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ থাকবে এবং দর্শকের মনে প্রভাব ফেলতে পারবেন। চরিত্র ছোট না বড় সেটা তাঁর কাছে কখনোই মুখ্য বিষয় ছিল না।
ফরিদা জালালের মতে, একজন অভিনেত্রীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চরিত্রের শক্তি, স্ক্রিন টাইম নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, অল্প সময়ের উপস্থিতিতেও যদি চরিত্রটি শক্তিশালী হয়, তাহলে সেটাই দর্শকের মনে দীর্ঘদিন থেকে যায় এবং শিল্পীর পরিচয় তৈরি করে।
এই ভাবনা থেকেই তিনি সচেতনভাবে নায়িকার গণ্ডি এড়িয়ে পার্শ্বচরিত্রকে বেছে নিয়েছিলেন। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণ হয়েছে, তাঁর সেই সিদ্ধান্তই ছিল সঠিক—কারণ পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেই তিনি আজ বলিউডে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন।
পার্শ্বচরিত্রেই খুঁজে পেয়েছেন বৈচিত্র্য
নায়িকার তুলনায় বোন, মা কিংবা অন্যান্য পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ যে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় এই বিষয়টি খুব শুরুতেই বুঝে গিয়েছিলেন ফরিদা জালাল। তাই সচেতনভাবেই তিনি এই ধরনের চরিত্রকে নিজের ক্যারিয়ারের মূল জায়গা হিসেবে বেছে নেন।
তিনি মনে করতেন, পার্শ্বচরিত্রে একজন অভিনেত্রীর নিজের অভিনয় দক্ষতা দেখানোর সুযোগ বেশি থাকে। এখানে আবেগ, সম্পর্ক, বাস্তবতা সবকিছু মিলিয়ে চরিত্রগুলোকে আরও জীবন্ত করে তোলা যায়। আর এই জায়গাটিই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল।
নায়িকা চরিত্র যেখানে অনেক সময় নির্দিষ্ট ছাঁচে বাঁধা থাকে, সেখানে পার্শ্বচরিত্রে থাকে নানা রকম বৈচিত্র্য। কখনো স্নেহময়ী মা, কখনো দুষ্টুমি ভরা বোন, আবার কখনো গভীর আবেগপূর্ণ চরিত্র সবকিছুতেই তিনি নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন।
নিজের অভিনয়গুণ দিয়ে ছোট চরিত্রকেও বড় করে তুলেছেন তিনি। অল্প সময়ের উপস্থিতিতেও দর্শকদের মনে শক্তভাবে দাগ কাটতে পেরেছেন, যা একজন প্রকৃত অভিনেত্রীর বড় সাফল্য।
দর্শকদের সঙ্গে আবেগের সংযোগ তৈরি করার এক অনন্য ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। সেই কারণেই পর্দায় তাঁর উপস্থিতি যতই কম হোক না কেন, তা সবসময়ই মনে রাখার মতো হয়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, পার্শ্বচরিত্রকে শুধু ‘সহায়ক’ হিসেবে না দেখে, সেটিকে নিজের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন ফরিদা জালাল। আর এই সিদ্ধান্তই তাঁকে বলিউডে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
কালজয়ী কাজের ঝুলি
ফরিদা জালাল এর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে রয়েছে অসংখ্য কালজয়ী সিনেমা ও স্মরণীয় কাজ, যা তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। তিনি এমন অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, যেগুলো আজও দর্শকদের মনে একইভাবে আবেগ জাগায়।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে এবং কুছ কুছ হোতা হ্যায় যেগুলো শুধু বাণিজ্যিকভাবেই সফল হয়নি, বরং ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। এই সিনেমাগুলোতে তাঁর উপস্থিতি ছিল অল্প সময়ের, কিন্তু সেই অল্প সময়েই তিনি দর্শকদের মনে দাগ কেটে গেছেন।
এ ছাড়া টেলিভিশন জগতেও তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়। ‘শারারাত’ ও ‘দেখ ভাই দেখ’ এর মতো জনপ্রিয় সিরিয়ালগুলোতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। পরিবারকেন্দ্রিক গল্পে তাঁর স্বাভাবিক অভিনয় মানুষকে সহজেই সংযোগ তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে বদলাতেও পিছিয়ে থাকেননি এই অভিনেত্রী। সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত ওয়েব সিরিজ ‘হীরামান্ডি’ তেও দেখা গেছে তাঁকে, যেখানে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তিনি আবারও নিজের অভিনয়ের শক্তি প্রমাণ করেছেন।
কৃতিত্ব দিলেন নির্মাতাদের
নিজের সাফল্যের পেছনে তিনি কৃতিত্ব দিয়েছেন করণ জোহর ও আদিত্য চোপড়া কে। তাঁদের সিনেমাই তাঁর ক্যারিয়ারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মজার ছলে তিনি বলেন, “করণ তো আমার ছেলের মতো। এখন ওদের কাছে শুধু আরও কাজ চাই।”





























