বৈরী আবহাওয়ার কারণে মহেশখালীর সামিটের টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় গ্যাসের মোট সরবরাহ নেমে এসেছে ১৯৩ কোটি ঘনফুটে।
এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র লোডশেডিংয়ের পর এবার রাজধানীতেও শুরু হয়েছে লোডশেডিং।
তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে শনিবার থেকে সামিটের টার্মিনাল দিয়ে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, গ্যাসের মজুত যাতে দ্রুত শেষ না হয়ে যায়, সে জন্য সোমবার সন্ধ্যা থেকেই সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ কমানো হয়।
মঙ্গলবার সরবরাহ ২০ কোটি ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়। বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত প্রতিদিন ১০ কোটি ঘনফুট করে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় সেটিও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
ফলে সংকটের মধ্যে থাকা গ্যাস বিতরণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে।
মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট।
অন্যদিকে দেশীয় কোম্পানি সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়।
এর ফলে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং রান্না, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকট দেখা দেয়।
এ ছাড়া সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, এক্সিলারেটের টার্মিনালে দুটি বয়লার রয়েছে। প্রতিটির সক্ষমতা ৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে একটি বয়লার আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অক্ষত বয়লারটি থেকে গত ৬ আগস্ট গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালুর কাজ এখনো চলছে।
বয়লারটি চালুর আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে।
তবে এই কাজ ঠিক কখন শুরু হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর সামিট শুরুতে প্রতিদিন ৫৬ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করেছিল। পরে তা কমিয়ে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট করা হয়।
গত সোমবার এলএনজি নিয়ে একটি নতুন জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পৌঁছালেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাহাজ থেকে সামিটের টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি।
এ কারণে সোমবার সন্ধ্যা ৭টার পর পেট্রোবাংলার নির্দেশে সামিট সরবরাহ কমিয়ে দেয়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সমুদ্রের পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়।
এর মধ্যে এলএনজি থেকে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে এলএনজি থেকে ৩০ কোটি ঘনফুটেরও কম গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
ফলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ ১৯৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যা এক দিন আগেও ছিল ২০৩ কোটি ঘনফুট।
এতে দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ সংস্থাকেই চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ সংস্থা তিতাসের দৈনিক চাহিদা ১৯০ থেকে ২০০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে তারা প্রায় ১৫৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পায়।
এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার পর তিতাসের সরবরাহ ১২০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। গত দুই দিন তারা প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট করে গ্যাস পেয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর ফলে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য গ্রাহকেরা আরও ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।
এদিকে গ্যাসের সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় তীব্র লোডশেডিং করা হচ্ছে।
এবার রাজধানীতেও সীমিত আকারে লোডশেডিং শুরু হয়েছে। বুধবার রাত ১১টা থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
পান্থপথ, যাত্রাবাড়ী, রাজাবাজার ও লালমাটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকেরা লোডশেডিংয়ের অভিযোগ করেছেন।
তবে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, পরিকল্পিতভাবে সহনীয় মাত্রায় লোডশেডিং করা হচ্ছে।
ডিপিডিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, রাতে ও দিনের কয়েকটি নির্দিষ্ট সময়ে সীমিত লোডশেডিং করা হবে।
রাত ১১টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৫০ মেগাওয়াট, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট এবং দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হবে।
বিকেল ৪টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত লোডশেডিং না করার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই এলাকায় একাধিকবার লোডশেডিং না করে ২৪ ঘণ্টায় একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ প্রায় এক ঘণ্টা ভোগান্তিতে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, গ্রামের মানুষের ভোগান্তি কিছুটা কমাতেই ঢাকায় সহনীয় মাত্রায় লোডশেডিং করা হচ্ছে।
তিনি জানান, আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে শুক্রবার রাতে এলএনজি জাহাজ থেকে সামিটের টার্মিনালে স্থানান্তর শুরু হতে পারে।
সেক্ষেত্রে শনিবার দুপুরের পর থেকে সামিট আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারবে।
সবকিছু ঠিক থাকলে রোববার থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বিপণিবিতান, মার্কেট ও দোকানপাটের সময়ও কমিয়েছে। নতুন নিয়মে এসব প্রতিষ্ঠান সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে।
সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ করার পাশাপাশি সব ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান না থাকায় আপাতত আবহাওয়ার ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হচ্ছে।
সমুদ্রের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলে এলএনজি সরবরাহ বাড়বে এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটও ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে।





























