ওষুধ গবেষণায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ইমরুল শাহরিয়ারের পথচলা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার গল্প তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসে তিনি যে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণায় কাজ করেছেন, সেটিই এখন মানুষের শরীরে পরীক্ষার পর্যায়ে পৌঁছেছে। আরও বড় বিষয় হলো, এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে বাংলাদেশে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) গবেষণাটির নিবিড় তদারকি করছে। ফলে গবেষণাগারে শুরু হওয়া একটি উদ্ভাবন এখন বাস্তব চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লুর চিকিৎসায় বর্তমানে বেশ কয়েকটি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ রয়েছে। তবে বিদ্যমান ওষুধগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে সীমাবদ্ধতা থাকায় নতুন ও আরও কার্যকর চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা চলছে বিশ্বজুড়ে। ইমরুলের পিএইচডি গবেষণার মূল লক্ষ্যও ছিল এমন একটি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ খুঁজে বের করা, যা ফ্লুর বিরুদ্ধে আরও কার্যকর হতে পারে। তাঁদের গবেষণার ফল ২০২৪ সালে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকী PNAS-এ প্রকাশিত হয়। গবেষণাটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসার পর বিবিসিও তাঁকে সাক্ষাৎকারের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। তখন পর্যন্ত ওষুধটির কার্যকারিতা প্রাণীর ওপর পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছিল।
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আসে প্রাক্-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পর। নতুন ওষুধ মানুষের জন্য নিরাপদ কি না এবং রোগের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর—তা যাচাই করতে শুরু হয় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। বর্তমানে ইমরুলদের উদ্ভাবিত ওষুধের ফেজ–২ ট্রায়াল চলছে বাংলাদেশে। এই পর্যায়ে ওষুধের নিরাপত্তার পাশাপাশি নির্দিষ্ট রোগীদের ওপর এর কার্যকারিতাও বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করা হয়। ইমরুলের মতে, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক নৈতিক নীতিমালা, চিকিৎসক ও গবেষকদের তত্ত্বাবধান এবং স্বেচ্ছাসেবীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এসব গবেষণা পরিচালিত হয়। নতুন কোনো ওষুধ মানুষের চিকিৎসায় পৌঁছানোর আগে এই পরীক্ষাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইমরুলের এই ওষুধ গবেষণা যাত্রার শুরু অবশ্য বাংলাদেশেই। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা ইমরুল চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল ও রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। রেড-গ্রিন রিসার্চ সেন্টারে কাজ করার পাশাপাশি বন্ধুদের নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত পানির বিকল্প খোঁজার একটি প্রকল্প আন্তর্জাতিক হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতাতেও জায়গা করে নেয়। গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ শেষ পর্যন্ত তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি পিএইচডির সুযোগ এনে দেয়। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে মাত্র চার বছরে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তিনি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যভিত্তিক বায়োটেক প্রতিষ্ঠান ইরাডিভিরে ডিসকভারি ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন ইমরুল। ড্রাগ ডিসকভারি বা নতুন ওষুধের কার্যকর উপাদান খুঁজে বের করার জটিল গবেষণায় তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। তাঁর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানটির শিকড়ও পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে। গবেষণার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্যও বড় স্বপ্ন দেখছেন এই বিজ্ঞানী। তাঁর লক্ষ্য, দেশে মৌলিক ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণার পরিবেশ তৈরি করা। কারণ বাংলাদেশের ওষুধশিল্প জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে শক্তিশালী হলেও নতুন ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণায় এখনো বড় পরিসরে এগিয়ে যেতে পারেনি।
বাংলাদেশে চলমান ফেজ–২ ট্রায়ালের ফল তাই শুধু ইমরুলের ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়, দেশের বিজ্ঞান গবেষণার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রায়াল সফল হলে উদ্ভাবিত ওষুধটি পরবর্তী ধাপের পরীক্ষার দিকে এগোতে পারবে এবং ভবিষ্যতে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে এই গবেষণা দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানী বিদেশে বসে এমন গবেষণা করতে পারেন, যার বাস্তব প্রয়োগের পরীক্ষা হচ্ছে নিজের দেশেই। ইমরুল ভবিষ্যতে ‘বেঙ্গল আলকেমি’ নামে একটি বায়োটেক উদ্যোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করছেন। তাঁর এই পথচলা বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের নতুনভাবে বিজ্ঞান ও মৌলিক ওষুধ গবেষণা নিয়ে ভাবতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।




























