ঢাকা ০৯:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ক্যাপসিকাম কি কমাতে পারে ক্যান্সারের ঝুঁকি? Logo ইনস্টাগ্রাম-ফেসবুকের বড় পরিবর্তন, শিশু গোপনীয়তা মামলায় মেটার বিপদ Logo ব্রুনো ফার্নান্দেজকে ছাড়বে না ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ট্রান্সফারে বড় সিদ্ধান্ত Logo চিকিৎসক না হয়েও চোখের চিকিৎসা, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কঠোর ব্যবস্থা Logo শেষ ইনকা নগরীর চমকপ্রদ রহস্য, হারানো ভিলকাবাম্বা কীভাবে খুঁজে পেলেন ‘রিয়েল ইন্ডিয়ানা জোন্স’ Logo অনুপম রায় বাবা হলেন, এল নতুন অতিথি Logo বাংলাদেশ নারী দল: এশিয়া কাপ ও এশিয়ান গেমসের শক্তিশালী স্কোয়াড Logo নতুন পে স্কেল চলতি বছরেই বাস্তবায়ন হবে : অর্থমন্ত্রী Logo একটি ডিম, একটি কলা এবং বড় একটি স্বপ্ন Logo জ্বালানি সংকট সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে : নৌপরিবহন মন্ত্রী

একটি ডিম, একটি কলা এবং বড় একটি স্বপ্ন

স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে শিশুদের পুষ্টিকর খাবার

একটি শিশু যখন সকালে খালি পেটে বিদ্যালয়ে যায়, তখন তার হাতে থাকা বই-খাতার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় ক্ষুধা। ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করতে থাকা একটি শিশুর পক্ষে শ্রেণিকক্ষে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা, শিক্ষকের কথা শোনা কিংবা নতুন কিছু শেখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের সঙ্গে শিশুর পুষ্টির বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত।

বাংলাদেশে গত এক দশকে শিশুপুষ্টির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম—এমন শিশুর হার ২০১৩ সালের ৪২ শতাংশ থেকে ২০১৯ সালে ২৮ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে কম ওজনের শিশুর হার ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ২২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।

তবে অগ্রগতি হলেও সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। এখনো দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু পুষ্টিঘাটতি নিয়ে বেড়ে উঠছে। দরিদ্র পরিবার, দুর্গম অঞ্চল এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।

একটি শিশুর দৈনন্দিন পুষ্টি তার শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি মস্তিষ্কের বিকাশ, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং শেখার সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা হলে তা শুধু ক্ষুধা কমায় না; শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও পাঠে মনোযোগ বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

এই বাস্তবতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচিকে শুধু খাবার বিতরণের উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত একটি কর্মসূচি।

২০২৬ সালের ২৯ মার্চ শুরু হওয়া নতুন পাইলট স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে ইতোমধ্যে যশোর, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা ও নড়াইলের ছয়টি উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এই কর্মসূচির আওতায় ৯১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক লাখ ১৬ হাজার ৮৬১ শিক্ষার্থী যুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদ্যালয়গামী শিশুদের পুষ্টির চাহিদার একটি অংশ পূরণের পাশাপাশি তাদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে উৎসাহিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

পাইলট পর্যায়ের এই কর্মসূচি ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। কোন ধরনের খাবার শিশুদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য, সরবরাহব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর করা যায় এবং কর্মসূচির মাধ্যমে উপস্থিতি ও শিখনফলে কী পরিবর্তন আসে—এসব বিষয় মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে বিদ্যালয়ভিত্তিক খাদ্য সহায়তার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১১ সালে মাত্র ৫৫ হাজার শিশুকে নিয়ে ‘দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি’ শুরু হয়েছিল।

পরবর্তী এক দশকে কর্মসূচিটির ব্যাপ্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে এটি ১০৪টি উপজেলার ১৫ হাজার ২৮৯টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ লাখ শিশুর কাছে পৌঁছেছিল।

২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কর্মসূচিটিতে প্রায় ৫৮ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ অর্থ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে এসেছে।

আগের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ৭৫ গ্রাম ফোর্টিফাইড বিস্কুট দেওয়া হতো। এতে প্রায় ৩৩৮ কিলোক্যালরি শক্তি এবং দৈনিক অণুপুষ্টির চাহিদার প্রায় ৬৭ শতাংশ পূরণের ব্যবস্থা ছিল।

এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে পুষ্টি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হলে বিপুলসংখ্যক শিশুকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব।

দারিদ্র্য একটি শিশুর শিক্ষাজীবনে নানা ধরনের বাধা তৈরি করতে পারে। পরিবারের আয় কম হলে শিশুর জন্য প্রতিদিন প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পরিবারকে খাবারের পরিমাণ ও মান—দুই ক্ষেত্রেই আপস করতে হয়।

এ অবস্থায় বিদ্যালয়ে খাবারের ব্যবস্থা থাকলে পরিবারের ওপর খাদ্য ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমতে পারে। পাশাপাশি শিশু বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য বাড়তি আগ্রহও পেতে পারে।

বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের জন্য নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বয়সে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ দ্রুত ঘটে। তাই পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মূল দর্শন হলো শিশুকে এমন খাবার দেওয়া, যা তার দৈনন্দিন পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সহায়তা করবে এবং একই সঙ্গে সহজে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

একটি ডিমে উচ্চমানের প্রোটিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। অন্যদিকে কলা সহজলভ্য একটি ফল, যাতে শক্তি ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। এর সঙ্গে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার যুক্ত করা গেলে শিশুর জন্য আরও ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব।

তবে স্কুল ফিডিংয়ের ক্ষেত্রে শুধু খাবার সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়। খাবারের মান, নিরাপত্তা, বৈচিত্র্য, সংরক্ষণ ও নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

একজন ক্ষুধার্ত শিক্ষার্থীর জন্য শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। ক্ষুধা তার চিন্তাভাবনা ও শেখার সক্ষমতায় তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে পুষ্টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশও উন্নত করা সম্ভব।

স্কুল ফিডিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যালয়ে উপস্থিতি। কোনো শিশু যদি জানে বিদ্যালয়ে গেলে সে পুষ্টিকর খাবার পাবে, তাহলে দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগ্রহ বাড়তে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে ঝরে পড়ার হার কমানো এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে।

স্কুল ফিডিং কর্মসূচিকে তাই শুধু একটি খাদ্য প্রকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর সঙ্গে শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতার বিষয় জড়িত।

একটি শিশু যদি সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে, নিয়মিত বিদ্যালয়ে যায় এবং মনোযোগ দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সেই শিশুই দেশের মানবসম্পদে পরিণত হয়।

এই কারণে স্কুল ফিডিংয়ে ব্যয় করা অর্থকে শুধু তাৎক্ষণিক ব্যয় হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বিনিয়োগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

নতুন পাইলট কর্মসূচির সফলতার জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, খাবারের মান ও পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যন্ত ও দরিদ্র এলাকার বিদ্যালয়গুলোতেও নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামত নিতে হবে। শিশুরা যে খাবার খেতে আগ্রহী নয়, তা নিয়মিত সরবরাহ করলে কর্মসূচির উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।

এ ছাড়া কর্মসূচির প্রভাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, ঝরে পড়ার হার, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, শিখনফল এবং পুষ্টিগত অবস্থার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কর্মসূচিটির কার্যকারিতা যাচাই করা যেতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, একটি ডিম কিংবা একটি কলা হয়তো একটি শিশুর পুরো জীবনের সমস্যার সমাধান করবে না। কিন্তু বিদ্যালয়ে বসে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার সুযোগ একটি শিশুকে ক্ষুধার চিন্তা থেকে কিছুটা মুক্ত করে বইয়ের পাতায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। সেই সুযোগ থেকেই হয়তো কোনো একদিন জন্ম নিতে পারে একটি বড় স্বপ্ন—আর সেই স্বপ্নই বদলে দিতে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ।

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্যাপসিকাম কি কমাতে পারে ক্যান্সারের ঝুঁকি?

একটি ডিম, একটি কলা এবং বড় একটি স্বপ্ন

Update Time : ০৮:০৬:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

একটি শিশু যখন সকালে খালি পেটে বিদ্যালয়ে যায়, তখন তার হাতে থাকা বই-খাতার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় ক্ষুধা। ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করতে থাকা একটি শিশুর পক্ষে শ্রেণিকক্ষে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা, শিক্ষকের কথা শোনা কিংবা নতুন কিছু শেখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের সঙ্গে শিশুর পুষ্টির বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত।

বাংলাদেশে গত এক দশকে শিশুপুষ্টির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম—এমন শিশুর হার ২০১৩ সালের ৪২ শতাংশ থেকে ২০১৯ সালে ২৮ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে কম ওজনের শিশুর হার ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ২২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।

তবে অগ্রগতি হলেও সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। এখনো দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু পুষ্টিঘাটতি নিয়ে বেড়ে উঠছে। দরিদ্র পরিবার, দুর্গম অঞ্চল এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।

একটি শিশুর দৈনন্দিন পুষ্টি তার শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি মস্তিষ্কের বিকাশ, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং শেখার সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা হলে তা শুধু ক্ষুধা কমায় না; শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও পাঠে মনোযোগ বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

এই বাস্তবতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচিকে শুধু খাবার বিতরণের উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত একটি কর্মসূচি।

২০২৬ সালের ২৯ মার্চ শুরু হওয়া নতুন পাইলট স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে ইতোমধ্যে যশোর, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা ও নড়াইলের ছয়টি উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন  শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে আবারও সায়েন্স ল্যাবে শিক্ষার্থীরা, চার জেলায় বিক্ষোভ, অবরোধ

এই কর্মসূচির আওতায় ৯১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক লাখ ১৬ হাজার ৮৬১ শিক্ষার্থী যুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদ্যালয়গামী শিশুদের পুষ্টির চাহিদার একটি অংশ পূরণের পাশাপাশি তাদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে উৎসাহিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

পাইলট পর্যায়ের এই কর্মসূচি ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। কোন ধরনের খাবার শিশুদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য, সরবরাহব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর করা যায় এবং কর্মসূচির মাধ্যমে উপস্থিতি ও শিখনফলে কী পরিবর্তন আসে—এসব বিষয় মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে বিদ্যালয়ভিত্তিক খাদ্য সহায়তার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১১ সালে মাত্র ৫৫ হাজার শিশুকে নিয়ে ‘দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি’ শুরু হয়েছিল।

পরবর্তী এক দশকে কর্মসূচিটির ব্যাপ্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে এটি ১০৪টি উপজেলার ১৫ হাজার ২৮৯টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ লাখ শিশুর কাছে পৌঁছেছিল।

২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কর্মসূচিটিতে প্রায় ৫৮ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ অর্থ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে এসেছে।

আগের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ৭৫ গ্রাম ফোর্টিফাইড বিস্কুট দেওয়া হতো। এতে প্রায় ৩৩৮ কিলোক্যালরি শক্তি এবং দৈনিক অণুপুষ্টির চাহিদার প্রায় ৬৭ শতাংশ পূরণের ব্যবস্থা ছিল।

এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে পুষ্টি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হলে বিপুলসংখ্যক শিশুকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব।

দারিদ্র্য একটি শিশুর শিক্ষাজীবনে নানা ধরনের বাধা তৈরি করতে পারে। পরিবারের আয় কম হলে শিশুর জন্য প্রতিদিন প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পরিবারকে খাবারের পরিমাণ ও মান—দুই ক্ষেত্রেই আপস করতে হয়।

আরও পড়ুন  সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নির্দেশনা জারি

এ অবস্থায় বিদ্যালয়ে খাবারের ব্যবস্থা থাকলে পরিবারের ওপর খাদ্য ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমতে পারে। পাশাপাশি শিশু বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য বাড়তি আগ্রহও পেতে পারে।

বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের জন্য নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বয়সে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ দ্রুত ঘটে। তাই পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মূল দর্শন হলো শিশুকে এমন খাবার দেওয়া, যা তার দৈনন্দিন পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সহায়তা করবে এবং একই সঙ্গে সহজে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

একটি ডিমে উচ্চমানের প্রোটিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। অন্যদিকে কলা সহজলভ্য একটি ফল, যাতে শক্তি ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। এর সঙ্গে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার যুক্ত করা গেলে শিশুর জন্য আরও ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব।

তবে স্কুল ফিডিংয়ের ক্ষেত্রে শুধু খাবার সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়। খাবারের মান, নিরাপত্তা, বৈচিত্র্য, সংরক্ষণ ও নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

একজন ক্ষুধার্ত শিক্ষার্থীর জন্য শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। ক্ষুধা তার চিন্তাভাবনা ও শেখার সক্ষমতায় তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে পুষ্টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশও উন্নত করা সম্ভব।

স্কুল ফিডিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যালয়ে উপস্থিতি। কোনো শিশু যদি জানে বিদ্যালয়ে গেলে সে পুষ্টিকর খাবার পাবে, তাহলে দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগ্রহ বাড়তে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে ঝরে পড়ার হার কমানো এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন  এসএসসি ফল পুনর্নিরীক্ষণ শুরু, আবেদন করবেন যেভাবে

স্কুল ফিডিং কর্মসূচিকে তাই শুধু একটি খাদ্য প্রকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর সঙ্গে শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতার বিষয় জড়িত।

একটি শিশু যদি সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে, নিয়মিত বিদ্যালয়ে যায় এবং মনোযোগ দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সেই শিশুই দেশের মানবসম্পদে পরিণত হয়।

এই কারণে স্কুল ফিডিংয়ে ব্যয় করা অর্থকে শুধু তাৎক্ষণিক ব্যয় হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বিনিয়োগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

নতুন পাইলট কর্মসূচির সফলতার জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, খাবারের মান ও পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যন্ত ও দরিদ্র এলাকার বিদ্যালয়গুলোতেও নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামত নিতে হবে। শিশুরা যে খাবার খেতে আগ্রহী নয়, তা নিয়মিত সরবরাহ করলে কর্মসূচির উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।

এ ছাড়া কর্মসূচির প্রভাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, ঝরে পড়ার হার, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, শিখনফল এবং পুষ্টিগত অবস্থার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কর্মসূচিটির কার্যকারিতা যাচাই করা যেতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, একটি ডিম কিংবা একটি কলা হয়তো একটি শিশুর পুরো জীবনের সমস্যার সমাধান করবে না। কিন্তু বিদ্যালয়ে বসে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার সুযোগ একটি শিশুকে ক্ষুধার চিন্তা থেকে কিছুটা মুক্ত করে বইয়ের পাতায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। সেই সুযোগ থেকেই হয়তো কোনো একদিন জন্ম নিতে পারে একটি বড় স্বপ্ন—আর সেই স্বপ্নই বদলে দিতে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ।