জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার বিচার ও অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করেছেন নারী শিক্ষার্থীরা। রোববার সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের দুটি ফটকে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলনে নামেন তাঁরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা ও গাফিলতির প্রতিবাদেই তাঁরা এই কর্মসূচি পালন করছেন। তাঁদের দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযুক্তকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের জবাবদিহিও নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
এর আগে শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন আন্দোলনকারীরা। পরে প্রক্টর কার্যালয়ের ফটকে তালা ঝুলিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদ জানান তাঁরা। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রক্টরিয়াল টিম পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ মে রাত ১১টার দিকে ক্যাম্পাসের পরিত্যক্ত ফজিলাতুন্নেছা হল–সংলগ্ন সড়কে এক ছাত্রীকে টেনেহিঁচড়ে অন্ধকার স্থানে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর পুরো ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করা হয়।
ঘটনার পরপরই শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা জোরদার ও বিচার নিশ্চিতের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এমন গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হলেও প্রশাসনের তৎপরতা অত্যন্ত ধীর। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
রোববারের অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নারী শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় তাঁরা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান। আন্দোলনের কারণে প্রশাসনিক ভবনের কার্যক্রমও কিছু সময়ের জন্য ব্যাহত হয়।
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফাহমিদা মুন বলেন, তাঁদের ছয় দফা দাবির মধ্যে প্রথম দাবিই ছিল ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আসামিকে ধরতে ব্যর্থ হলে পুরো প্রক্টরিয়াল বডিকে পদত্যাগ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রক্টর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ক্যাম্পাসে একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার দায় প্রশাসন এড়িয়ে যেতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রশাসনের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনকারীরা বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুধু আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তাঁরা জানতে চান তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছে এবং আসামিকে শনাক্ত করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে প্রশাসন স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেনি বলে অভিযোগ তাঁদের।
নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৫৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আদৃতা রায় বলেন, প্রশাসনের দায়িত্ববোধ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এমন একটি স্পর্শকাতর ঘটনায় প্রশাসনের আরও সক্রিয় ও সংবেদনশীল ভূমিকা নেওয়া উচিত ছিল।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কাছে তদন্ত ও গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে চেয়েছিলেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানানো হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের হতাশা আরও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আদৃতা রায় আরও বলেন, ঘটনার ১০৬ ঘণ্টা পার হলেও কার্যকর কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুধু বলা হচ্ছে যে কাজ চলছে, কিন্তু কী ধরনের কাজ হচ্ছে কিংবা তদন্ত কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কিছু জানানো হয়নি।
শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা এখন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। রাতে চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তাঁদের মধ্যে।
আন্দোলনকারীরা বলেন, একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তাই শুধু এই ঘটনার বিচার নয়, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনাও জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা।
এদিকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, তদন্ত কমিটি গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত বিচার দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে থাকলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা গেছে। অনেকে বলছেন, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নির্জন ও অন্ধকার এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং টহল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীরা আরও দাবি করেছেন, ক্যাম্পাসে সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং নিরাপত্তা কর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা চালুর কথাও বলেছেন তাঁরা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং অভিযুক্তকে শনাক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।
তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছেন, শুধু আশ্বাসে তাঁরা আর ভরসা পাচ্ছেন না। দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এই ঘটনা আবারও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, শুধু তদন্ত কমিটি নয়, কার্যকর বিচার ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

























