লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় থানায় মামলা করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতা—এমন একটি ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম হারুনুর রশিদ, যিনি উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মঙ্গলবার (৫ মে) বিকেলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হারুনুর রশিদ দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। বিশেষ করে এলাকায় মশালমিছিল ও রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করার অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। এই মামলাসহ আরও কয়েকটি অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ বিভিন্ন সময় অভিযান চালাচ্ছিল।
ঘটনার সূত্রপাত মূলত একটি পারিবারিক ও জমিসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে। হারুনুর রশিদের পরিবারের সদস্যদের দাবি, গত সোমবার বিকেলে চরলক্ষ্মী গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁর বড় ভাই মঞ্জু মোল্লার ওপর হামলা চালায়। এতে গুরুতর আহত হন মঞ্জু মোল্লা, যিনি মালদ্বীপে প্রবাসী হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সম্প্রতি দেশে ফিরেছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাঁকে আহত করা হয়।
এই ঘটনার পর রাতে থানায় মামলা করতে যান হারুনুর রশিদ। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি রায়পুর থানায় গেলে পুলিশ তাঁকে সেখান থেকেই গ্রেপ্তার করে। তাঁর ভগ্নিপতি নুর মোহাম্মদ জানান, হারুনুর রশিদের বিরুদ্ধে পূর্বে মামলা থাকলেও তিনি জামিনে মুক্ত ছিলেন এবং নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিচ্ছিলেন।
তবে পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, হারুনুর রশিদ দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছিল। তিনি আরও জানান, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে তাঁর নেতৃত্বে মশালমিছিল করার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছিল। সেই মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয়দের মধ্যে এ ঘটনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ বলছেন, একজন আসামি থানায় গেলে তাকে আইনের আওতায় আনা স্বাভাবিক বিষয়। আবার অন্যদিকে, পরিবারের দাবি—তিনি একটি ভিন্ন ঘটনার বিচার চাইতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত বিরোধ অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে এবং সাধারণ মানুষও বিভ্রান্তিতে পড়ে। এই ঘটনাও তেমন একটি উদাহরণ হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
বর্তমানে আহত মঞ্জু মোল্লা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত বিচার ও হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, হারুনুর রশিদের গ্রেপ্তারের পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানা গেছে, যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে তারা সতর্ক রয়েছে।
এই ঘটনাটি স্থানীয় রাজনীতি, আইন প্রয়োগ এবং ব্যক্তিগত বিরোধ—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে জনমনে আগ্রহ ও আলোচনা বাড়ছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে কী বেরিয়ে আসে এবং আদালত এই মামলায় কী সিদ্ধান্ত দেয়।






















