ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি: ট্রেনে ছোড়া পাথরে এক চোখ হারালেন আইনজীবী—এমন মর্মান্তিক ঘটনায় আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে রেলপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় চলন্ত ট্রেনে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন শ্যামল চন্দ্র দাস (৪৫) নামে এক আয়কর আইনজীবী। দীর্ঘ অস্ত্রোপচারের পরও তার ডান চোখের দৃষ্টি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের সদস্যরা জানান, গত সোমবার সকালে পারিবারিক কাজে ঢাকায় গিয়েছিলেন শ্যামল চন্দ্র দাস। দিনের কাজ শেষে রাতে চট্টগ্রামগামী তুর্ণা এক্সপ্রেসে করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই যাত্রা চলছিল। তবে গভীর রাতে একটি ভয়াবহ ঘটনা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
জানা গেছে, রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে ট্রেনটি আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর রেলওয়ে স্টেশন এলাকা অতিক্রম করছিল। এ সময় বাইরে থেকে হঠাৎ কয়েকজন দুর্বৃত্ত চলন্ত ট্রেন লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে। একটি পাথর সজোরে এসে আঘাত করে শ্যামল চন্দ্র দাসের ডান চোখে। আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে তিনি গুরুতর আহত হন এবং প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন। সহযাত্রীরা দ্রুত তাকে প্রাথমিক সহায়তা দেন। পরে ট্রেনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে পৌঁছালে তাকে নামিয়ে দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থার গুরুতরতা বিবেচনা করে দ্রুত জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। এরপর তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয় এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হয়। গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টাব্যাপী অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকরা চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। গুরুতর আঘাতের কারণে তার ডান চোখের দৃষ্টি সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যায়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, আকস্মিক এই ঘটনায় শ্যামল চন্দ্র দাস ও তার পরিবার গভীর মানসিক আঘাতের মধ্যে রয়েছেন। একটি স্বাভাবিক যাত্রা যে এমন ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা তারা কখনও কল্পনাও করেননি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই কিছু দুর্বৃত্ত ট্রেন লক্ষ্য করে ইট-পাথর ছুড়ে যাত্রীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। কিন্তু এসব ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে তারা মনে করেন।
রেলপথ ব্যবহারকারী অনেক যাত্রীও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ শুধু দুষ্টুমি নয়, এটি সরাসরি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার ওপর হামলার শামিল। এ ধরনের ঘটনায় কেউ চোখ হারাচ্ছেন, কেউ গুরুতর আহত হচ্ছেন, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে।ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহ আলম জানিয়েছেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পর আহত ব্যক্তি ও তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পাথর নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত করতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় তদন্ত চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে রেল পুলিশ। এদিকে এই ঘটনার কয়েক দিন আগেও একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনের আউটার পৈরতলা এলাকায় চলন্ত ট্রেনে ছোড়া পাথরের আঘাতে নাইমুল হাসান রাব্বি নামে এক যুবক আহত হন। ওই ঘটনায় তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। পরে তাকে উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মাথায় পাঁচটি সেলাই দেন। রাব্বি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একই অঞ্চলে পরপর দুটি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যাত্রীদের দাবি, রেলপথের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একটি গুরুতর অপরাধ। এটি শুধু সম্পদের ক্ষতি করে না, বরং মানুষের স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি এবং প্রাণহানির কারণ হতে পারে। তাই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, রেল কর্তৃপক্ষ এবং জনসাধারণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, রেলপথে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় নিরীহ যাত্রীরা প্রতিনিয়ত এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকির মুখোমুখি হতে থাকবেন।




























