বিশ্বের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখনো দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ হলেও প্রবৃদ্ধির দিক থেকে প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ০.৮৯ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার
মতো দেশগুলো উল্লেখযোগ্য হারে রপ্তানি বাড়িয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ডব্লিউটিওর ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিসটিকস: কি ইনসাইটস অ্যান্ড ট্রেন্ডস ইন ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর বৈশ্বিক পণ্য ও সেবা বাণিজ্য ৭ শতাংশ বেড়ে ৩৪.৬৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে পণ্য বাণিজ্য বেড়েছে ৬ শতাংশ এবং সেবা বাণিজ্য বেড়েছে ৮ শতাংশ। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যে সেবা খাতের অংশীদারিত্বও ২০০৫ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মোট ৫৭৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। আগের বছরের ৫৫০ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এটি প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ বৈশ্বিক বাজারে পোশাকের চাহিদা বাড়লেও সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ।
ডব্লিউটিওর তথ্য বলছে, টানা দুই বছর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরেই রয়েছে। গত বছর রপ্তানি হয়েছে ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। প্রবৃদ্ধি খুব কম হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ৭ শতাংশ থেকে কমে ৬.৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম গত বছর ৩৭.৫১ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। দেশটির রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০.৫ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে তাদের অংশীদারিত্বও বেড়ে ৬.৫৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি অবস্থান তৈরি করেছে।
বিশ্ববাজারে চীনের বাজার হিস্যা গত কয়েক বছর ধরে কমলেও বাংলাদেশ সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ এবং পাল্টা শুল্কের কারণে চীনের বাজার অংশ কমেছে। তবে সেই শূন্যস্থান দখলে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি সফল হয়েছে।
ডব্লিউটিওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে চীনের বৈশ্বিক বাজার হিস্যা ছিল প্রায় ৩১.৫ শতাংশ। গত বছর তা কমে ২৭.৩৫ শতাংশে নেমে এলেও দেশটি এখনো ১৫৭ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। যদিও তাদের রপ্তানি প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে, তবুও চীনের রপ্তানি বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
ভারতও ধারাবাহিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। গত বছর দেশটি প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫.৫ শতাংশ বেশি। ফলে ভারতের বৈশ্বিক বাজার হিস্যা ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে তুরস্কের রপ্তানি কমে যাওয়ায় তাদের বাজার হিস্যাও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
শীর্ষ ১০ রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে কম্বোডিয়া। দেশটি গত বছর ১১.৫৬ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধির ফলে কম্বোডিয়ার বৈশ্বিক বাজার হিস্যা বেড়ে ২ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক মনে করেন, বাংলাদেশের ধীর প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, কম্বোডিয়া ও ভারত সরকারি সহায়তায় আগ্রাসী বিপণন করছে এবং ভিয়েতনাম দক্ষ জনবল, পণ্য বৈচিত্র্য ও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশকেও দ্রুত একটি জাতীয় কর্মকৌশল গ্রহণ করে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ভিয়েতনামের সফল মডেল অনুসরণ করলে বৈশ্বিক বাজারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে।

























