ঢাকা ০২:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

বিশ্বকাপে দর্শকদের জন্য সহজ হচ্ছে মার্কিন ভিসা

বিশ্বকাপে দর্শকদের জন্য সহজ হচ্ছে মার্কিন ভিসা

উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ঘিরে দর্শকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নির্দিষ্ট কিছু দেশের ফুটবল সমর্থকদের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের ভিসা জামানত বা বন্ড জমা দেওয়ার নিয়ম শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে যাওয়া বৈধ দর্শকদের জন্য এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর সদস্য ও টিকিটধারী সমর্থকদের জন্য ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। এতদিন যেসব উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের জন্য ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত জমা দিতে হতো, সেই নিয়মে বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। তবে এই সুবিধা পেতে আবেদনকারীদের নির্ধারিত অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থায় নিবন্ধিত থাকতে হবে।

বিশ্বকাপকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। আয়োজক দেশ হিসেবে বিপুলসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকে বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ অতিরিক্ত আর্থিক চাপের কারণে অনেক ফুটবলপ্রেমীর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছিল।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর থেকেই ভিসা নীতিতে নানা কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নজরদারি ও আর্থিক শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এসব ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ভিসা জামানত কর্মসূচি চালু হয়, যেখানে আবেদনকারীদের কয়েক হাজার ডলার অগ্রিম জমা দিতে হতো।

এই অর্থ মূলত নিরাপত্তা নিশ্চয়তার অংশ হিসেবে রাখা হতো। যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে নিজ দেশে ফিরে গেলে সেই অর্থ ফেরত দেওয়া হতো। কিন্তু বাস্তবে এই বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করা অনেক সাধারণ সমর্থকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে উপস্থিত থাকার স্বপ্ন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরা নামদার বলেছেন, বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে বৈধ ভ্রমণকে উৎসাহিত করাই তাদের লক্ষ্য। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তিনি জানান, ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চায় যা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও স্মরণীয় আসর হিসেবে বিবেচিত হবে।

ফিফাও যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। সংস্থাটির এক মুখপাত্র বলেছেন, সফল বিশ্বকাপ আয়োজন নিশ্চিত করতে মার্কিন সরকার ও হোয়াইট হাউস টাস্কফোর্সের সঙ্গে তাদের সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে। দর্শকদের জন্য ভিসা সহজীকরণ বিশ্বকাপকে আরও প্রাণবন্ত ও বৈশ্বিক অংশগ্রহণমূলক করে তুলবে বলেও মনে করছে ফিফা।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় আসর হতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেবে এই টুর্নামেন্টে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচগুলো। আয়োজকেরা আশা করছেন, কোটি কোটি দর্শক সরাসরি মাঠে গিয়ে খেলা উপভোগ করবেন।

যেসব দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা জামানত বাধ্যতামূলক ছিল, তাদের মধ্যে রয়েছে আলজেরিয়া, কেপ ভার্দে, আইভরি কোস্ট, সেনেগাল ও তিউনিসিয়া। এসব দেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য নতুন এই ছাড় বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। কারণ বিশ্বকাপের মতো আসরে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক বাধা কমে যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার অনেক দেশের সমর্থকেরা ফুটবলের প্রতি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হলেও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে যেতে পারেন না। কয়েক বছরের আয়ের সমান অর্থ জামানত হিসেবে জমা দেওয়ার শর্ত অনেকের জন্য অযৌক্তিক ছিল। ফলে নতুন সিদ্ধান্ত তাদের জন্য আশার খবর হয়ে এসেছে।

অন্যদিকে, সব দেশের জন্য অবশ্য এই সুবিধা সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে হাইতি ও ইরানের নাগরিকদের ওপর এখনও ব্যাপক বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ কার্যত অত্যন্ত কঠিন হয়ে আছে।

বিশেষ করে ইরান সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশটি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার শিকার হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। সেই প্রেক্ষাপটে ইরানি নাগরিকদের ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

হাইতির পরিস্থিতিও আলাদা ধরনের সংকট তৈরি করেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য ও নিরাপত্তা সমস্যার কারণে দেশটির নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সত্ত্বেও হাইতির সমর্থকেরা হয়তো মাঠে গিয়ে নিজেদের দলকে সমর্থন দিতে পারবেন না।

‘মেন্ডোজা ল’ ফার্ম’ পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৫ হাজার ডলারের জামানত সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দেশের নাগরিকদের প্রায় তিন বছরের গড় আয়ের সমান। এতে সাধারণ মানুষের পক্ষে ভিসার আবেদন করাই প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। গবেষণাটি আরও উল্লেখ করে, এই নীতির কারণে বিশ্বকাপের দর্শক বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি ছিল।

বিশ্বকাপ বরাবরই কেবল ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়, বরং বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনমেলা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বের নানা প্রান্তের সমর্থকেরা নিজ নিজ দেশের পতাকা নিয়ে গ্যালারিতে উপস্থিত হন। সেই পরিবেশই বিশ্বকাপকে অনন্য করে তোলে। তাই দর্শকদের উপস্থিতি সীমিত হয়ে গেলে আসরের প্রাণশক্তিও কমে যেতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসন শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, পশ্চিমা মিত্রদেশগুলোর পর্যটকদের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি বাড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত তথ্য পর্যালোচনার অনুমতি দিতে হচ্ছে। নিরাপত্তার অজুহাতে নেওয়া এসব পদক্ষেপ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও সমালোচনা রয়েছে।

তবে মার্কিন প্রশাসনের দাবি, বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে এই ধরনের ব্যবস্থা জরুরি। একই সঙ্গে বৈধ পর্যটক ও ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য সহজ পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টাও চলছে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ভিসা নীতিতে এই আংশিক শিথিলতা সেই ভারসাম্য রক্ষার অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১১ জুন। আয়োজক তিন দেশ ইতোমধ্যে নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও দর্শক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছে। স্টেডিয়াম উন্নয়ন থেকে শুরু করে পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন পর্যন্ত নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসর হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপের প্রতি আগ্রহ সবসময়ই ব্যাপক থাকে। এবার অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বাড়ায় আগ্রহও বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলে লাখো সমর্থকের যাতায়াত নিশ্চিত করতে সহজ ভিসা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চায়, তবে দর্শকদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে। কারণ ফুটবল শুধু মাঠের খেলা নয়, এটি বৈশ্বিক সংযোগ ও সংস্কৃতিরও প্রতীক। তাই সব দেশের সমর্থকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই সফল বিশ্বকাপ আয়োজনের অন্যতম শর্ত।

জনপ্রিয় সংবাদ

গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগ নেতা বিএনপিতে যোগদান

বিশ্বকাপে দর্শকদের জন্য সহজ হচ্ছে মার্কিন ভিসা

Update Time : ০১:৪২:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ঘিরে দর্শকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নির্দিষ্ট কিছু দেশের ফুটবল সমর্থকদের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের ভিসা জামানত বা বন্ড জমা দেওয়ার নিয়ম শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে যাওয়া বৈধ দর্শকদের জন্য এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর সদস্য ও টিকিটধারী সমর্থকদের জন্য ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। এতদিন যেসব উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের জন্য ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত জমা দিতে হতো, সেই নিয়মে বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। তবে এই সুবিধা পেতে আবেদনকারীদের নির্ধারিত অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থায় নিবন্ধিত থাকতে হবে।

বিশ্বকাপকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। আয়োজক দেশ হিসেবে বিপুলসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকে বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ অতিরিক্ত আর্থিক চাপের কারণে অনেক ফুটবলপ্রেমীর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছিল।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর থেকেই ভিসা নীতিতে নানা কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নজরদারি ও আর্থিক শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এসব ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ভিসা জামানত কর্মসূচি চালু হয়, যেখানে আবেদনকারীদের কয়েক হাজার ডলার অগ্রিম জমা দিতে হতো।

এই অর্থ মূলত নিরাপত্তা নিশ্চয়তার অংশ হিসেবে রাখা হতো। যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে নিজ দেশে ফিরে গেলে সেই অর্থ ফেরত দেওয়া হতো। কিন্তু বাস্তবে এই বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করা অনেক সাধারণ সমর্থকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে উপস্থিত থাকার স্বপ্ন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল।

আরও পড়ুন  যুক্তরাষ্ট্রে গৌতম আদানির বিরুদ্ধে মামলা নিষ্পত্তির পথে

যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরা নামদার বলেছেন, বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে বৈধ ভ্রমণকে উৎসাহিত করাই তাদের লক্ষ্য। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তিনি জানান, ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চায় যা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও স্মরণীয় আসর হিসেবে বিবেচিত হবে।

ফিফাও যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। সংস্থাটির এক মুখপাত্র বলেছেন, সফল বিশ্বকাপ আয়োজন নিশ্চিত করতে মার্কিন সরকার ও হোয়াইট হাউস টাস্কফোর্সের সঙ্গে তাদের সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে। দর্শকদের জন্য ভিসা সহজীকরণ বিশ্বকাপকে আরও প্রাণবন্ত ও বৈশ্বিক অংশগ্রহণমূলক করে তুলবে বলেও মনে করছে ফিফা।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় আসর হতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেবে এই টুর্নামেন্টে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচগুলো। আয়োজকেরা আশা করছেন, কোটি কোটি দর্শক সরাসরি মাঠে গিয়ে খেলা উপভোগ করবেন।

যেসব দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা জামানত বাধ্যতামূলক ছিল, তাদের মধ্যে রয়েছে আলজেরিয়া, কেপ ভার্দে, আইভরি কোস্ট, সেনেগাল ও তিউনিসিয়া। এসব দেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য নতুন এই ছাড় বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। কারণ বিশ্বকাপের মতো আসরে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক বাধা কমে যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার অনেক দেশের সমর্থকেরা ফুটবলের প্রতি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হলেও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে যেতে পারেন না। কয়েক বছরের আয়ের সমান অর্থ জামানত হিসেবে জমা দেওয়ার শর্ত অনেকের জন্য অযৌক্তিক ছিল। ফলে নতুন সিদ্ধান্ত তাদের জন্য আশার খবর হয়ে এসেছে।

আরও পড়ুন  বাংলাদেশের মেয়েরা ইতিহাস গড়ল হকিতে

অন্যদিকে, সব দেশের জন্য অবশ্য এই সুবিধা সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে হাইতি ও ইরানের নাগরিকদের ওপর এখনও ব্যাপক বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ কার্যত অত্যন্ত কঠিন হয়ে আছে।

বিশেষ করে ইরান সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশটি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার শিকার হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। সেই প্রেক্ষাপটে ইরানি নাগরিকদের ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

হাইতির পরিস্থিতিও আলাদা ধরনের সংকট তৈরি করেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য ও নিরাপত্তা সমস্যার কারণে দেশটির নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সত্ত্বেও হাইতির সমর্থকেরা হয়তো মাঠে গিয়ে নিজেদের দলকে সমর্থন দিতে পারবেন না।

‘মেন্ডোজা ল’ ফার্ম’ পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৫ হাজার ডলারের জামানত সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দেশের নাগরিকদের প্রায় তিন বছরের গড় আয়ের সমান। এতে সাধারণ মানুষের পক্ষে ভিসার আবেদন করাই প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। গবেষণাটি আরও উল্লেখ করে, এই নীতির কারণে বিশ্বকাপের দর্শক বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি ছিল।

বিশ্বকাপ বরাবরই কেবল ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়, বরং বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনমেলা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বের নানা প্রান্তের সমর্থকেরা নিজ নিজ দেশের পতাকা নিয়ে গ্যালারিতে উপস্থিত হন। সেই পরিবেশই বিশ্বকাপকে অনন্য করে তোলে। তাই দর্শকদের উপস্থিতি সীমিত হয়ে গেলে আসরের প্রাণশক্তিও কমে যেতে পারে।

আরও পড়ুন  টেবিল টেনিসে বাংলাদেশের স্বর্ণজয়, শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল অনূর্ধ্ব-১৯ দল

ট্রাম্প প্রশাসন শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, পশ্চিমা মিত্রদেশগুলোর পর্যটকদের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি বাড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত তথ্য পর্যালোচনার অনুমতি দিতে হচ্ছে। নিরাপত্তার অজুহাতে নেওয়া এসব পদক্ষেপ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও সমালোচনা রয়েছে।

তবে মার্কিন প্রশাসনের দাবি, বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে এই ধরনের ব্যবস্থা জরুরি। একই সঙ্গে বৈধ পর্যটক ও ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য সহজ পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টাও চলছে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ভিসা নীতিতে এই আংশিক শিথিলতা সেই ভারসাম্য রক্ষার অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১১ জুন। আয়োজক তিন দেশ ইতোমধ্যে নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও দর্শক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছে। স্টেডিয়াম উন্নয়ন থেকে শুরু করে পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন পর্যন্ত নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসর হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপের প্রতি আগ্রহ সবসময়ই ব্যাপক থাকে। এবার অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বাড়ায় আগ্রহও বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলে লাখো সমর্থকের যাতায়াত নিশ্চিত করতে সহজ ভিসা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চায়, তবে দর্শকদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে। কারণ ফুটবল শুধু মাঠের খেলা নয়, এটি বৈশ্বিক সংযোগ ও সংস্কৃতিরও প্রতীক। তাই সব দেশের সমর্থকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই সফল বিশ্বকাপ আয়োজনের অন্যতম শর্ত।