জাহের আলভী কারাগারে: স্ত্রীকে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় রিমান্ড শেষে আদালতের নতুন আদেশ।
জাহের আলভী কারাগারে—ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা মো. নিয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া, যিনি জাহের আলভী নামে পরিচিত, তাঁকে স্ত্রীকে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় দুই দিনের রিমান্ড শেষে আবারও কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (৩০ জুন) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালত শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। মামলাটি ইতোমধ্যেই দেশের শোবিজ অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, দুই দিনের রিমান্ড শেষ হওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা জাহের আলভীকে আদালতে হাজির করেন। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এদিন তাঁর পক্ষে কোনো জামিন আবেদন করা হয়নি বলে বাদীপক্ষের আইনজীবী নিশ্চিত করেছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবজাল হোসাইন মৃধা গণমাধ্যমকে জানান, মামলার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে আদালতের কাছে তাঁরা অনুরোধ করেছেন, ঘটনার সঙ্গে যদি অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হোক। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে, তদন্ত কর্মকর্তা ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) মিরপুর বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক মো. আব্দুল মালেক আদালতে জমা দেওয়া আবেদনে উল্লেখ করেন, রিমান্ড চলাকালে আসামিকে বিভিন্ন বাংলাদেশ বিনোদন, ইকরা মৃত্যু, ঢাকার আদালত,দিক থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সেই জিজ্ঞাসাবাদে মামলার ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যা তদন্তে সহায়ক হবে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে মামলার ঘটনার সঙ্গে আসামির সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত মিলেছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে তদন্ত এখনও চলমান থাকায় এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এই মামলার সূত্রপাত হয় চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওই দিন রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসা থেকে জাহের আলভীর স্ত্রী আফরা ইবনাত ইকরার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি প্রথমে আত্মহত্যা হিসেবে সামনে এলেও পরে ইকরার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন, পারিবারিক কলহ এবং দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন সমস্যার কারণে তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন।
পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে রাজধানীর পল্লবী থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলায় জাহের আলভীকে প্রধান আসামি করা হয়। মামলা দায়েরের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘটনার বিভিন্ন দিক যাচাই করতে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়ার কাজ অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে জাহের আলভী আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেছিলেন। তবে আদালত তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠান। পরে তদন্ত কর্মকর্তা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত শুনানি শেষে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সেই রিমান্ড শেষ হওয়ার পর মঙ্গলবার তাঁকে আবার আদালতে হাজির করা হয় এবং আদালত পুনরায় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার শুনানির সময় জাহের আলভীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তিনি নির্দোষ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অন্য অনেক পরিবারের মতোই মাঝে মাঝে অভিমান, মতবিরোধ ও ঝগড়া হতো। তবে এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি, যা তাঁর স্ত্রীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তিনি আদালতের কাছে দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
অন্যদিকে, তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আত্মহত্যার প্ররোচনার মতো মামলায় শুধু মৌখিক অভিযোগ নয়, ডিজিটাল আলামত, পারিবারিক যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মামলার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এদিকে জাহের আলভীকে কারাগারে পাঠানোর খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন, আবার কেউ আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগে কাউকে দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা না করার আহ্বান জানিয়েছেন। আইন বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, এই মামলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং আদালতে উপস্থাপিত তথ্যের ওপর।
বর্তমানে মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত শেষ হলে পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। যদি তদন্তে অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে যাবে। আর পর্যাপ্ত প্রমাণ না মিললে তদন্ত প্রতিবেদনে সেই বিষয়টিও উল্লেখ করা হবে। ফলে মামলার ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে তদন্তে উঠে আসা তথ্য-প্রমাণ এবং আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
উল্লেখ্য, এই মামলাটি এখনও বিচারাধীন। তাই আদালতের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত আইনগতভাবে জাহের আলভীকে দোষী বলা যায় না। একইভাবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্বও সম্পূর্ণভাবে আদালত ও তদন্তকারী সংস্থার ওপর নির্ভরশীল। তদন্ত শেষ হওয়ার পর আদালতে উপস্থাপিত তথ্য, সাক্ষ্য এবং প্রমাণের ভিত্তিতেই এই বহুল আলোচিত মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারিত হবে।





























