বিশ্বকাপ ফুটবল অর্থনীতি এখন আর শুধু মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসর ঘিরে তৈরি হয় বিশাল বাণিজ্যিক বাজার। টিকিট, সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, পর্যটন, জার্সি বিক্রি থেকে শুরু করে নানা খাতে ঘোরে শত শত কোটি ডলারের অর্থনীতি। তবে এই অর্থনৈতিক উৎসবে সবাই সমানভাবে লাভবান হন না। কেউ পান বড় মুনাফা, আবার কেউ বহন করেন বাড়তি খরচের চাপ।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আর্থিক বিজয়ী নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ থেকে ফিফা রেকর্ড পরিমাণ আয় করেছিল। ২০২৬ সালের ৪৮ দলের বিশ্বকাপ সেই আয়ের রেকর্ড আরও বাড়াবে বলে ধারণা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা। সম্প্রচারস্বত্ব, টিকিট বিক্রি, লাইসেন্স, আতিথেয়তা ও বৈশ্বিক স্পনসরশিপ থেকেই ফিফার বড় অংশের আয় আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ থেকে আয় আরও বাড়াতে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও বিবেচনায় নিতে পারে ফিফা। বড় বাজারের দেশগুলো যুক্ত হলে দর্শকসংখ্যা, সম্প্রচার আয় এবং বাণিজ্যিক মূল্য আরও বাড়বে। ফলে মাঠের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিশ্বকাপ ফিফার জন্য সবচেয়ে লাভজনক আয়োজন।
তবে দর্শকদের জন্য বিশ্বকাপ অনেক সময় হয়ে ওঠে ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতা। মাঠে বসে খেলা দেখার স্বপ্ন পূরণ করতে অনেক সমর্থককে টিকিট, বিমানভাড়া, হোটেল ও খাবারের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়। বিশেষ করে টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনাও হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী টিকিটের দাম বাড়ানোর নীতিকে অনেকেই সাধারণ সমর্থকদের জন্য কঠিন বলে মনে করেছেন।
অন্যদিকে সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান ও বড় ব্র্যান্ডগুলো বিশ্বকাপ থেকে বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা পায়। টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে সম্প্রচারস্বত্ব কিনলেও বিজ্ঞাপন ও দর্শকসংখ্যার কারণে সেই বিনিয়োগ থেকে লাভের সুযোগ তৈরি হয়। অ্যাডিডাস, কোকা-কোলার মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোও বিশ্বকাপকে নিজেদের পণ্য প্রচারের বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে।
আয়োজক দেশগুলোর জন্যও বিশ্বকাপ অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন শহরে লাখো পর্যটক ও ফুটবলপ্রেমীর আগমন স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ছোট ব্যবসায়ীদের আয় বাড়াতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, বড় ক্রীড়া আয়োজনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভ সব সময় প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপের সবচেয়ে কার্যকর সুফল দেখা যায় অবকাঠামো উন্নয়নে। নতুন পরিবহনব্যবস্থা, স্টেডিয়াম বা নগর উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগলে অর্থনৈতিক সুবিধা স্থায়ী হয়। কিন্তু শুধু কয়েক সপ্তাহের পর্যটন ও সাময়িক কর্মসংস্থান সবসময় বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারে না।
বিশ্বকাপের আরেক বড় লাভবান খাত হলো ক্রীড়া সামগ্রীর বাজার। জাতীয় দলের জার্সি, ফুটবল পণ্য ও স্মারক সামগ্রীর বিক্রি বিশ্বকাপের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বর্তমানে ফুটবল জার্সি শুধু খেলার পোশাক নয়, ফ্যাশনের অংশ হিসেবেও জনপ্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পুরোনো নকশার জার্সির চাহিদা বাড়ছে।
তবে সব ব্যবসা বিশ্বকাপ থেকে সমান সুবিধা পায় না। অনেক আয়োজক শহরে প্রত্যাশামতো হোটেল বুকিং না হওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। কারণ অনেক পর্যটক বড় ভিড় এড়িয়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন। ফলে বিশ্বকাপ ঘিরে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক প্রত্যাশা সব ক্ষেত্রে পূরণ হয় না।
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল অর্থনীতি হলো লাভ ও ব্যয়ের এক জটিল হিসাব। ফিফা, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান ও বড় ব্র্যান্ডগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হলেও সাধারণ দর্শক ও কিছু স্থানীয় ব্যবসায়ীকে বাড়তি খরচের মুখোমুখি হতে হয়। তাই বিশ্বকাপ শুধু কে মাঠে ট্রফি জিতল, সেই গল্প নয়; অর্থনীতির মাঠেও এখানে কেউ বিজয়ী হয়, কেউ আবার হিসাব মেলাতে ব্যস্ত থাকে।


























