পঞ্চগড় থেকে ঢাকাগামী দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় আবারও যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) উল্লাপাড়া ও জামতৈল রেলস্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পাথরের আঘাতে গুরুতর আহত হন ২২ বছর বয়সী যাত্রী মো. সাব্বির হোসেন। তার ডান চোখে মারাত্মক আঘাত লাগে এবং প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও রেলওয়ে সূত্র জানায়, দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেনটি স্বাভাবিক গতিতে ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। এ সময় ট্রেনটি উল্লাপাড়া ও জামতৈল স্টেশনের মাঝামাঝি এলাকায় পৌঁছালে ট্রেন লক্ষ্য করে অজ্ঞাত ব্যক্তি বা কয়েকজন দুর্বৃত্ত হঠাৎ পাথর ছুড়ে মারে। ছোড়া একটি পাথর জানালার পাশে বসে থাকা যাত্রী সাব্বির হোসেনের ডান চোখে সজোরে আঘাত করে।
আঘাত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি চিৎকার করে উঠলে ট্রেনের অন্য যাত্রীরা দ্রুত তাকে প্রাথমিকভাবে সেবা দেন। পরে ট্রেনটি জামতৈল স্টেশনে পৌঁছালে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে নামিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
আহত মো. সাব্বির হোসেন (২২) জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মো. দুলাল হোসেনের ছেলে। পরিবারের সদস্যরা জানান, ব্যক্তিগত কাজে তিনি ঢাকায় যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় পুরো পরিবার উদ্বেগে রয়েছে।
প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসকরা জানান, পাথরের আঘাতে সাব্বিরের ডান চোখে গুরুতর আঘাত লেগেছে। উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তার চোখের দৃষ্টিশক্তি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যাবে।
জামতৈল রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার রাকিবুর রহমান জানান, উল্লাপাড়া ও জামতৈল স্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। খবর পাওয়ার পর আহত যাত্রীকে দ্রুত স্টেশনে নামিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ বাজার রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, আহত যাত্রীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি পাথর নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত করতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একটি গুরুতর অপরাধ। এতে যাত্রীরা গুরুতর আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে। অতীতে দেশের বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের ঘটনায় বহু যাত্রী আহত হয়েছেন এবং কয়েকজন প্রাণও হারিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ শুধু দুষ্টুমি নয়; এটি জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তাই এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ঘটনার পর যাত্রীরা রেলপথের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল বাড়ানো, সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো এবং স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নিয়মিত টহল ও কঠোর শাস্তির মাধ্যমে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের মতো বিপজ্জনক প্রবণতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কিশোরদের বেপরোয়া আচরণ, স্থানীয় দুষ্কৃতকারী চক্রের তৎপরতা এবং সচেতনতার অভাবের কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। অনেক সময় এটি নিছক দুষ্টুমি মনে হলেও এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। চলন্ত ট্রেনের গতির কারণে ছোট একটি পাথরও মারাত্মক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ রেলওয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন রুটে রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি), রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল, নজরদারি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবুও বিস্তীর্ণ রেলপথে সবসময় নজরদারি রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের মতো ঘটনা প্রতিরোধে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এলাকায় এমন ঘটনার পরিকল্পনা বা সন্দেহজনক ব্যক্তির উপস্থিতি দেখা গেলে দ্রুত রেলওয়ে পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনকে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, চলন্ত ট্রেনে ইচ্ছাকৃতভাবে পাথর নিক্ষেপ জননিরাপত্তা বিপন্ন করার শামিল। এর ফলে গুরুতর আহত বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে দণ্ডবিধি এবং রেলওয়ে-সংশ্লিষ্ট প্রযোজ্য আইনের আওতায় ফৌজদারি মামলা হতে পারে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড—উভয় শাস্তিই হতে পারে।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা যাত্রীদের জানালার পাশে বসার সময় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে জনবসতিপূর্ণ এলাকা, রেলক্রসিং বা ঝুঁকিপূর্ণ অংশ অতিক্রম করার সময় জানালার বাইরে মাথা বা হাত না বের করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে ট্রেনের গার্ড, টিটিই বা রেলওয়ে পুলিশকে জানাতে বলা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ বাজার রেলওয়ে থানা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল শনাক্ত করে তদন্ত শুরু করেছে। আশপাশের এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে রেলপথসংলগ্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পাথর নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।
ঘটনার পর যাত্রী ও রেল-সংশ্লিষ্টরা চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের মতো অপরাধ রোধে আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথে নিয়মিত টহল, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একই সঙ্গে রেলযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।




























