ঢাকা ০৪:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উত্তপ্ত মরুভূমিতে উট সংকট: ভয়াবহ তাপপ্রবাহে বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০২:১৩:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
  • ৫২০

অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ উটের চিকিৎসা করছেন পশুচিকিৎসক। ছবি: সংগৃহীত

উট সংকট এখন শুধু আফ্রিকার পশুপালকদের নয়, পরিবেশবিদদের কাছেও বড় উদ্বেগের বিষয়। মরুভূমির সবচেয়ে সহনশীল প্রাণী হিসেবে পরিচিত উটও এখন ভয়াবহ তাপপ্রবাহের সঙ্গে লড়াই করতে হিমশিম খাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও যে প্রাণী দীর্ঘ সময় পানি ছাড়া বেঁচে থাকতে পারত, এখন সেই উটই অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা এতটাই বেড়েছে যে উটের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। একসময় যেসব এলাকায় উট ছিল মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী, সেখানে এখন তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে উঠছে।

ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম উষ্ণ ও শুষ্ক এলাকা। এখানকার অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উট পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছে। স্থানীয় খামারিদের ভাষ্য, এখন আগের তুলনায় বালু অনেক বেশি গরম হয়ে থাকে। ফলে উটের পায়ে ফোসকা পড়ে, চোখ দিয়ে পানি ঝরে, শরীরের লোম ঝরে যায় এবং অতিরিক্ত গরমে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক খামারি জানিয়েছেন, মাত্র এক মাসেই একাধিক উটশাবক মারা গেছে। এমনকি আগে যে বাতাস কিছুটা স্বস্তি দিত, সেটিও এখন গরম অনুভূত হয়। এই পরিবর্তন তাদের কাছে জলবায়ুর ভয়াবহ রূপের স্পষ্ট প্রমাণ।

উট সংকটে তীব্র গরমের প্রভাব
তীব্র তাপপ্রবাহে পানির খোঁজে মরুভূমির উট। ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও একই চিত্র তুলে ধরছে। দক্ষিণ ইথিওপিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উটের স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা এবং প্রজনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সোমালিয়ায় প্রায় ছয় হাজার পশুপালক পরিবারের ওপর পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, খরা ও অতিরিক্ত গরমের কারণে প্রায় অর্ধেক পরিবার উট হারিয়েছে। কিছু অঞ্চলে মৃত্যুহার ৭০ শতাংশেরও বেশি। কেনিয়ার পশুচিকিৎসকরাও জানিয়েছেন, গত দুই বছরে অতিরিক্ত তাপের কারণে উটের মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে হিট স্ট্রেসের কারণে সংক্রমণ ও নানা রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উট সহজেই গরম সহ্য করতে পারে। তাদের শরীরের বিশেষ গঠন, ঘন লোম এবং পানি সংরক্ষণের ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে মরুভূমিতে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। কিন্তু যখন দিনের পর দিন তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকে, তখন সেই স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও আর কার্যকর থাকে না। অতিরিক্ত গরমে উটের শরীরের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, খাবার গ্রহণ হ্রাস পায় এবং শরীরে ক্লান্তি তৈরি হয়। এর ফলে দুধ উৎপাদন কমে যায় এবং প্রজননেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) জানিয়েছে, উত্তর আফ্রিকা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা অঞ্চলগুলোর একটি। গত কয়েক দশকে সেখানে তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং অনেক এলাকায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গরমের পাশাপাশি পানির সংকট, সবুজ উদ্ভিদ কমে যাওয়া এবং ছায়ার অভাব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) গবেষকরাও সতর্ক করেছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে উট পালন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, উট সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পশুর জন্য পর্যাপ্ত পানি, ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল, উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং খরার সময় অতিরিক্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমাতে বৈশ্বিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ উট শুধু একটি প্রাণী নয়, আফ্রিকার লাখো মানুষের জীবিকা, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সংকট অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে মানুষের জীবন-জীবিকাও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।

জনপ্রিয় সংবাদ

উত্তপ্ত মরুভূমিতে উট সংকট: ভয়াবহ তাপপ্রবাহে বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি

Update Time : ০২:১৩:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

উট সংকট এখন শুধু আফ্রিকার পশুপালকদের নয়, পরিবেশবিদদের কাছেও বড় উদ্বেগের বিষয়। মরুভূমির সবচেয়ে সহনশীল প্রাণী হিসেবে পরিচিত উটও এখন ভয়াবহ তাপপ্রবাহের সঙ্গে লড়াই করতে হিমশিম খাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও যে প্রাণী দীর্ঘ সময় পানি ছাড়া বেঁচে থাকতে পারত, এখন সেই উটই অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা এতটাই বেড়েছে যে উটের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। একসময় যেসব এলাকায় উট ছিল মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী, সেখানে এখন তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে উঠছে।

ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম উষ্ণ ও শুষ্ক এলাকা। এখানকার অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উট পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছে। স্থানীয় খামারিদের ভাষ্য, এখন আগের তুলনায় বালু অনেক বেশি গরম হয়ে থাকে। ফলে উটের পায়ে ফোসকা পড়ে, চোখ দিয়ে পানি ঝরে, শরীরের লোম ঝরে যায় এবং অতিরিক্ত গরমে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক খামারি জানিয়েছেন, মাত্র এক মাসেই একাধিক উটশাবক মারা গেছে। এমনকি আগে যে বাতাস কিছুটা স্বস্তি দিত, সেটিও এখন গরম অনুভূত হয়। এই পরিবর্তন তাদের কাছে জলবায়ুর ভয়াবহ রূপের স্পষ্ট প্রমাণ।

আরও পড়ুন  মার্কিন অবরোধে অন্ধকারে কিউবা
উট সংকটে তীব্র গরমের প্রভাব
তীব্র তাপপ্রবাহে পানির খোঁজে মরুভূমির উট। ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও একই চিত্র তুলে ধরছে। দক্ষিণ ইথিওপিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উটের স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা এবং প্রজনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সোমালিয়ায় প্রায় ছয় হাজার পশুপালক পরিবারের ওপর পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, খরা ও অতিরিক্ত গরমের কারণে প্রায় অর্ধেক পরিবার উট হারিয়েছে। কিছু অঞ্চলে মৃত্যুহার ৭০ শতাংশেরও বেশি। কেনিয়ার পশুচিকিৎসকরাও জানিয়েছেন, গত দুই বছরে অতিরিক্ত তাপের কারণে উটের মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে হিট স্ট্রেসের কারণে সংক্রমণ ও নানা রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

আরও পড়ুন  খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ইরানের স্পিকার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উট সহজেই গরম সহ্য করতে পারে। তাদের শরীরের বিশেষ গঠন, ঘন লোম এবং পানি সংরক্ষণের ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে মরুভূমিতে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। কিন্তু যখন দিনের পর দিন তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকে, তখন সেই স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও আর কার্যকর থাকে না। অতিরিক্ত গরমে উটের শরীরের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, খাবার গ্রহণ হ্রাস পায় এবং শরীরে ক্লান্তি তৈরি হয়। এর ফলে দুধ উৎপাদন কমে যায় এবং প্রজননেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) জানিয়েছে, উত্তর আফ্রিকা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা অঞ্চলগুলোর একটি। গত কয়েক দশকে সেখানে তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং অনেক এলাকায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গরমের পাশাপাশি পানির সংকট, সবুজ উদ্ভিদ কমে যাওয়া এবং ছায়ার অভাব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) গবেষকরাও সতর্ক করেছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে উট পালন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন  সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী খুন, অপহরণের নাটক ফাঁস

পরিবেশবিদরা বলছেন, উট সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পশুর জন্য পর্যাপ্ত পানি, ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল, উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং খরার সময় অতিরিক্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমাতে বৈশ্বিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ উট শুধু একটি প্রাণী নয়, আফ্রিকার লাখো মানুষের জীবিকা, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সংকট অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে মানুষের জীবন-জীবিকাও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।