বয়সের ভার, দারিদ্র্য আর ছানিতে ঝাপসা হয়ে যাওয়া চোখ—এই তিনের সঙ্গে লড়াই করে দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার হাতুয়া গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী শুক্কুর মিয়া। একসময় অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালালেও দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। একসময় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, নিজের দৈনন্দিন কাজও অন্যের সহায়তা ছাড়া করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে সেই অন্ধকার জীবনেই আশার আলো হয়ে আসে বসুন্ধরা আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট। বিনামূল্যে ছানি অপারেশনের মাধ্যমে আবারও পরিষ্কারভাবে পৃথিবী দেখার সুযোগ পেয়েছেন শুক্কুর মিয়া। শুধু তিনি নন, একই উদ্যোগে আরও ৩৫ জন দরিদ্র রোগী ফিরে পেয়েছেন দৃষ্টিশক্তির নতুন আশা।
২০২৫ সালে কসবা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা শিবিরের খবর মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচার করা হয়। সেই খবর শুনেই চিকিৎসা শিবিরে অংশ নেন শুক্কুর মিয়া।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরীক্ষায় ধরা পড়ে, তার দুই চোখেই ছানি পড়েছে। গত বছর প্রথমে ডান চোখে সফল অস্ত্রোপচার করা হয়। চলতি বছর সফলভাবে বাম চোখেও ছানি অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে।
অস্ত্রোপচারের পর আবেগাপ্লুত শুক্কুর মিয়া বলেন,
“আল্লাহ উনাগোরে ভালো করুক। আমাগোর সব চিকিৎসা উনারাই করাইছে। খাওনদাওন সব ফ্রি। আইছি, এক টাকাও লাগে নাই। এখন আবার পরিষ্কার দেহতে পারতাছি।“
শুধু শুক্কুর মিয়া নন, কসবার আরও অনেক প্রবীণ মানুষ একই কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে চিকিৎসা পেয়েছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন—
- শহীদ মিয়া (৬২)
- শফিকুল মিয়া
- আব্দুল মান্নান মিয়া (৭৫)
আব্দুল মান্নান মিয়া জীবনের ৫২ বছর একটি জুট মিলে কাজ করেছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখে ছানি পড়ে। ফলে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা, চলাফেরা এমনকি পরিবারের সদস্যদের মুখও স্পষ্টভাবে দেখতে পারতেন না।
সফল অস্ত্রোপচারের পর তিনি বলেন, বহুদিন পর আবার নিজের চোখে পৃথিবী দেখতে পারবেন—এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
বসুন্ধরা আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং কসবার মা আমেনা গফুর চ্যারিটেবল হসপিটালের যৌথ উদ্যোগে গত ৭ জুলাই কসবায় একটি বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়।
ক্যাম্পে শতাধিক রোগীর চোখ পরীক্ষা করেন বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসকরা। তাদের মধ্যে যাদের অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, এমন ৩৬ জনকে নির্বাচন করা হয়।
পরে বুধবার (২৯ জুলাই) রোগীদের ঢাকায় বসুন্ধরা আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে আনা হয়।
সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা রোগীদের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে সুবিধাগুলো দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- ঢাকা পর্যন্ত যাতায়াত
- হাসপাতালে থাকা
- তিন বেলার খাবার
- প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা
- ছানি ও টেরিজিয়াম অপারেশন
- লেন্স প্রতিস্থাপন (যেখানে প্রয়োজন)
- অপারেশন-পরবর্তী ওষুধ
- ফলোআপ চিকিৎসা
- চিকিৎসকদের পরামর্শ
এসব সেবার জন্য রোগীদের কোনো ধরনের অর্থ ব্যয় করতে হয়নি।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকালে হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের তত্ত্বাবধানে—
- ৩০ জন রোগীর ছানি অপারেশন
- ৬ জন রোগীর টেরিজিয়াম (চোখের মাংসপিণ্ড) অপারেশন
সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, সব রোগী বর্তমানে সুস্থ আছেন এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
বসুন্ধরা আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) মাসউদুর রহমান বলেন,
“হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আমরা দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য নিয়মিত বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করছি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসা ক্যাম্প আয়োজন করে যাদের অপারেশন প্রয়োজন, তাদের ঢাকায় এনে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন,
“সম্প্রতি কুমিল্লাতেও একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও দেশের বিভিন্ন জেলায় এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।”
বাংলাদেশে ছানি এখনও বয়স্ক মানুষের অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো অস্ত্রোপচার করা হলে অধিকাংশ রোগীই স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান।
কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বহু মানুষ বছরের পর বছর চিকিৎসা নিতে পারেন না। ফলে কর্মক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার মানও নেমে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার কর্মসূচি শুধু মানুষের দৃষ্টিশক্তিই ফিরিয়ে দিচ্ছে না, তাদের কর্মক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং স্বাভাবিক জীবনেও ফিরিয়ে আনছে।
স্থানীয়দের মতে, গ্রামে গ্রামে গিয়ে রোগী শনাক্ত, বিনামূল্যে পরীক্ষা, ঢাকায় এনে অপারেশন এবং পরবর্তী চিকিৎসা দেওয়ার মতো উদ্যোগ দরিদ্র মানুষের জন্য বড় আশীর্বাদ। তারা চান, ভবিষ্যতে দেশের আরও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ ধরনের চিকিৎসা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হোক।
বসুন্ধরা আই হসপিটাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে ভবিষ্যতেও নিয়মিত ফ্রি আই ক্যাম্প, ছানি অপারেশন এবং অন্যান্য চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।




























