ফিফা বিশ্বকাপ বয়কট করার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা UEFA। বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে সংস্থাটি জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তাদের সদস্য দেশগুলোর কোনো জাতীয় দল ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না।
বৃহস্পতিবার UEFA-এর ৫৫টি সদস্য দেশের জাতীয় ফুটবল সংস্থার ভার্চুয়াল বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে এক বিবৃতিতে UEFA জানায়, ফিফা বিশ্বকাপ বয়কট করার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে এবং তারা ফিফার নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।
ফিফা সম্প্রতি FIFA Forward Enterprise (FFE) নামে একটি নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান টুর্নামেন্টগুলোর সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি ও লাইসেন্সিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে চায় ফিফা। সংস্থার দাবি, এই অর্থ সদস্য দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হবে।
তবে UEFA-এর মতে, বিশ্বকাপ কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়, বরং এটি বিশ্ব ফুটবলের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। তাই এর মালিকানার কোনো অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।
সংস্থাটি তাদের বিবৃতিতে বলেছে, “বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে খেলোয়াড়, জাতীয় দল এবং সমর্থকদের অবদানে গড়ে উঠেছে। এর কোনো অংশই ব্যক্তিগত মালিকানার কাছে হস্তান্তর করা যাবে না।”
UEFA আরও সতর্ক করেছে, যদি বিনিয়োগকারীরা বিশ্বকাপের মালিকানায় অংশীদার হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো খেলার স্বার্থে নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের আর্থিক লাভের কথা বিবেচনা করে নেওয়া হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক ফুটবলের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংস্থাটির ভাষায়, ফুটবলের ভবিষ্যৎ কখনোই শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফার ওপর নির্ভর করতে পারে না। জাতীয় ফুটবল সংস্থা, খেলোয়াড়, ক্লাব এবং সমর্থকদের স্বার্থকে বিনিয়োগকারীদের লাভের নিচে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
ফিফা বিশ্বকাপ বয়কট প্রসঙ্গে UEFA আরও জানিয়েছে, ফিফা যদি পুরো পরিকল্পনা বাতিল করে এবং ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ বা অন্য কোনো প্রতিযোগিতার মালিকানায় বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ না দেওয়ার বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা দেয়, তাহলেই তারা এই অবস্থান পুনর্বিবেচনা করবে।
ফিফার প্রস্তাব নিয়ে শুধু ইউরোপ নয়, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা Concacaf-ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিকল্পনা সদস্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে যথাযথ আলোচনা ছাড়াই প্রকাশ করা হয়েছে। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (AFC) একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করলেও আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (CAF) সদস্য দেশগুলোকে প্রস্তাবটি নিজ নিজভাবে পর্যালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই পরিকল্পনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার দাবি, এটি একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং বিশ্ব ফুটবলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করার জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার মতে, অতিরিক্ত অর্থের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফুটবল উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে।
তবে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর কঠোর অবস্থানের ফলে ফিফা বিশ্বকাপ বয়কট ইস্যু এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিফার সদস্য দেশগুলোকে এই প্রস্তাবের ওপর ভোট দিতে হবে। সেই ভোটের ফলই নির্ধারণ করবে বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে।


























