বিপদ-আপদে জীবন যখন অসহনীয় মনে হয়, তখন অনেকের মনেই মৃত্যুর চিন্তা আসে। দীর্ঘ কষ্ট, প্রিয়জন হারানো, অসুস্থতা কিংবা নানা সংকটে কেউ কেউ মনে করেন, মৃত্যুই হয়তো সব যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, বিপদের কারণে মৃত্যু কামনা না করে ধৈর্য ধরতে হবে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন পরিস্থিতিতে মৃত্যু কামনা করতে নিষেধ করেছেন এবং এর পরিবর্তে বিশেষ একটি দোয়া শিখিয়েছেন।
মানুষের জীবনে সুখের পাশাপাশি দুঃখও আসবে—এটাই দুনিয়ার বাস্তবতা। কোরআনে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, মানুষকে ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে এবং ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিপদ আসা মানেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি বা বান্দাকে ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং কঠিন সময়ও একজন মুমিনের জন্য পরীক্ষার অংশ হতে পারে।
বিপদের তীব্রতায় মানুষ অনেক সময় শুধু বর্তমান কষ্টটুকুই দেখতে পায়। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কীভাবে বদলে যেতে পারে, তা সে জানে না। আজ যে পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই বলে মনে হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সেটিই হয়তো বদলে যেতে পারে। তাই সাময়িক কষ্টের কারণে জীবনের শেষ চেয়ে নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক পথ নয়।
এ বিষয়ে সরাসরি নির্দেশনা পাওয়া যায় সহিহ বুখারির একটি হাদিসে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো বিপদে পড়ে তোমাদের কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। তবে একান্তই যদি এমন কথা বলতে হয়, তাহলে সে যেন দোয়া করে—‘হে আল্লাহ, যতদিন জীবন আমার জন্য কল্যাণকর, ততদিন আমাকে জীবিত রাখুন এবং যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর, তখন আমাকে মৃত্যু দিন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৭১)
এই দোয়াটির মধ্যে একজন মুমিনের আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতার শিক্ষা রয়েছে। মানুষ জানে না কোন সময় তার জন্য কল্যাণকর, কিন্তু আল্লাহ সবকিছু জানেন। তাই নিজের আবেগ বা অসহায়তার মুহূর্তে জীবনের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াই ইসলামের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কষ্টের সময় ধৈর্য ধরার আরেকটি বড় কারণ হলো, মুমিনের জন্য দুঃখ-কষ্টও সওয়াবের কারণ হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিমের ক্লান্তি, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট—এমনকি কাঁটার আঘাত পর্যন্ত—এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তার কিছু গুনাহ ক্ষমা করে দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৪১-৫৬৪২)
তাই বিপদের সময় নিজেকে একা না ভেবে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া, নামাজ ও দোয়ায় মনোযোগ দেওয়া এবং বিশ্বস্ত মানুষের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাস্তব সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি। অসহনীয় মানসিক কষ্টকে চেপে না রেখে পরিবার, কাছের মানুষ বা প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া দুর্বলতার পরিচয় নয়।
ইসলাম মানুষকে কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হতে শেখায় না। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩) তাই কঠিন সময় যত দীর্ঘই মনে হোক, মুমিনের জন্য আশা, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসার পথ খোলা থাকে।




























