পুলিশ নিয়োগে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। বাংলাদেশ পুলিশের জনবল ঘাটতি কমাতে নতুন করে ৪ হাজার এসআই, ৪০০ সার্জেন্ট এবং ১০ হাজার কনস্টেবল পদ সৃষ্টির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে জনবল বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নতুন পদগুলো সৃজন হলে দেশের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি রংপুরেও পুলিশের জনবল বাড়বে। সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা।
নতুন পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে কনস্টেবল পদ। ১০ হাজার নতুন কনস্টেবল নিয়োগের উদ্যোগ এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে। এর পাশাপাশি গ্রেড-১০ পর্যায়ে ৪ হাজার নিরস্ত্র এসআই এবং ৪০০ সার্জেন্ট পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে সব মিলিয়ে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নতুন পদ তৈরি হতে যাচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন ইউনিটে এসআই পদে নিয়োগের প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়েছে। গত ১০ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি পর্যালোচনা সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রস্তাবও সেখানে বিবেচনায় নেওয়া হয়।
পুলিশ নিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই গুরুত্ব দিয়ে আসছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ওপর যে চাপ রয়েছে, তা সামাল দিতে পর্যাপ্ত জনবল প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকার। নতুন পদ সৃষ্টি হলে সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে দ্রুত ১০ হাজার নতুন কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হবে। সে সময় তিনি জানান, নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাওয়ার পর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কথা বলা হয়েছিল।
নতুন উদ্যোগের ফলে যারা পুলিশ বাহিনীতে চাকরির সুযোগ খুঁজছেন, তাদের মধ্যেও আগ্রহ বাড়তে পারে। বিশেষ করে কনস্টেবল, এসআই ও সার্জেন্ট পদে নিয়োগের খবর চাকরিপ্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখন পর্যন্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদনের সময়সূচি, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা বয়সসীমা সম্পর্কে বিস্তারিত ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তাই আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট যোগ্যতা বা আবেদনের তারিখ নিয়ে নিশ্চিত তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রম শুধু অপরাধ দমনেই সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনসহ নানা কাজে পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা রয়েছে। ফলে জনবল সংকট থাকলে নিয়মিত দায়িত্ব পালনের ওপরও চাপ বাড়তে পারে।
নতুন জনবল যুক্ত হলে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও বেশি সদস্য মোতায়েন করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে জনসংখ্যা বেশি এমন এলাকা কিংবা যেখানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাড়তি জনবল প্রয়োজন, সেখানে নতুন নিয়োগের সুফল পাওয়া যেতে পারে।
তবে শুধু সদস্য সংখ্যা বাড়ালেই পুলিশের সক্ষমতা পুরোপুরি বাড়বে না। প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, যানবাহন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সুবিধাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার সেই বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে পুলিশের যানবাহন ও জলযানের ঘাটতি রাজস্ব বাজেটের আওতায় পূরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অর্থাৎ সরকারের পরিকল্পনাটি শুধু পুলিশ নিয়োগ কেন্দ্রিক নয়। জনবল বৃদ্ধির পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও পরিবহন সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব ব্যবস্থা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যক্রম আরও গতিশীল হতে পারে।
এসআই, সার্জেন্ট ও কনস্টেবল—তিনটি পদই পুলিশের দায়িত্ব কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কনস্টেবলরা মাঠপর্যায়ে পুলিশের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন। সার্জেন্টরা মূলত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আর এসআই পদে তদন্ত, মামলা পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই তিন পর্যায়ে জনবল বাড়ানোর পরিকল্পনা পুলিশের সামগ্রিক সক্ষমতার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে নতুন পদ সৃষ্টির পর নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রশিক্ষণ দিয়ে মাঠপর্যায়ে সদস্যদের দায়িত্বে আনতে কিছুটা সময় লাগবে। বিশেষ করে পুলিশের মতো একটি বাহিনীতে নিয়োগের পর দীর্ঘ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হয়। ফলে পদ সৃষ্টির সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে মাঠপর্যায়ে নতুন সদস্য পাওয়া যাবে—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা করা। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স, শারীরিক যোগ্যতা, আবেদন পদ্ধতি, পরীক্ষার ধাপ ও অন্যান্য শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনানুষ্ঠানিক তথ্যের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিজ্ঞপ্তিকেই চূড়ান্ত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সব মিলিয়ে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে ১৪ হাজার ৪০০ নতুন পদ সৃষ্টির উদ্যোগ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এর মধ্যে ৪ হাজার এসআই, ৪০০ সার্জেন্ট এবং ১০ হাজার কনস্টেবল রয়েছে। এখন পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং পরবর্তী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির দিকে নজর থাকবে চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষের।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন পুলিশের জনবল সংকট কমতে পারে, অন্যদিকে তেমনি বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য সরকারি চাকরির নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে কত দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন হয় এবং নতুন সদস্যদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে মাঠে নামানো যায় তার ওপর।




























