কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় ধানকাটা শ্রমিকের পরিচয়ে বাড়িতে ঢুকে ছমিরন খাতুন (৬০) নামের এক গৃহকর্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় আরও একজন পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থাটি।
পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের পর তিন আসামিই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকায় পিবিআই কুমিল্লা জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মতিয়ার রহমান।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ঢাকার কদমতলী এলাকার শরীফুল ইসলাম শান্ত (২৭), কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কালিরহাট যশপুর কাজী বাড়ির মো. মাসুম বিল্লা ওরফে রবিন (৩১) এবং লাকসাম উপজেলার মোহাম্মদপুর এলাকার আরাফাত হোসেন (১৪)। তাদের মধ্যে মাসুম বিল্লাকে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে শনাক্ত করেছে পিবিআই।
পিবিআইয়ের তথ্যমতে, গত ৩ মে সকালে চান্দিনা উপজেলার অলিপুর গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে ছমিরন খাতুনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই সময় তার শয়নকক্ষের দরজা খোলা ছিল। ঘরের কাঠের আলমারিও খোলা অবস্থায় পাওয়া যায় এবং কাপড়চোপড় ছিল এলোমেলো।
ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে বাড়িতে থাকা ধানকাটা শ্রমিকদের বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। তদন্তে জানা যায়, ধান কাটার শ্রমিক হিসেবে ওই বাড়িতে অবস্থান করা কয়েকজন ব্যক্তি টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেছেন।
তদন্তের একপর্যায়ে পিবিআই জানতে পারে, গ্রেপ্তার তিনজন আগে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ফিশারি ঘাটে একসঙ্গে কাজ করতেন। পরে তারা ধানকাটা শ্রমিকের পরিচয়ে কুমিল্লায় আসেন এবং ছমিরন খাতুনের বাড়িতে অবস্থান নেন।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ধান কাটার কাজ ঠিকমতো না জানা এবং ধান নষ্ট হওয়ার বিষয়কে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের সঙ্গে ছমিরন খাতুন ও তার স্বামীর কথা-কাটাকাটি হয়। পরে রাতে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়লে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাত আনুমানিক ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে আসামিরা ছমিরন খাতুনের শয়নকক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর তার কাছ থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে তারা পালিয়ে যান।
পিবিআই বলছে, হত্যাকাণ্ডটি আকস্মিক ছিল না; বরং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। তদন্তে আসামিদের পারস্পরিক পরিচয়, আগে একসঙ্গে কাজ করার তথ্য এবং ঘটনার পর তাদের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো সামনে আসে।
পুলিশের তদন্তে আরও উঠে আসে, শ্রমিকের পরিচয় ব্যবহার করে বাড়িতে অবস্থান নেওয়ায় আসামিরা পরিবারের সদস্যদের আস্থা অর্জনের সুযোগ পেয়েছিলেন। পরে রাতে পরিবারের অন্য সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়ার পর তারা হত্যাকাণ্ড ও লুটপাটের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।
গ্রেপ্তারের পর আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে পিবিআই। পরে তিনজনকে আদালতে হাজির করা হলে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এ ঘটনায় আরও একজন জড়িত এবং তিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চান্দিনার অলিপুর গ্রামের এই হত্যাকাণ্ডে ধানকাটা শ্রমিকের পরিচয় ব্যবহার করে একটি বাড়িতে প্রবেশ, রাতে গৃহকর্ত্রীকে হত্যা এবং পরে টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে। পিবিআইয়ের তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও আসামিদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সামনে এসেছে।



























