নুসরাত হত্যা মামলা সংক্রান্ত বহুল প্রতীক্ষিত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও শুনানির পর এই চাঞ্চল্যকর মামলার চূড়ান্ত বিচারিক রূপ সামনে এসেছে। ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার এই ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের ভিত্তিতে হাইকোর্ট এই রায় প্রদান করেন।
প্রকাশিত ১১২ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ জন আসামির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। আদালত দুই জন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন এবং চার জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন। বাকি দশ জন আসামিকে অপরাধে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। মামলার মূল অভিযুক্ত তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে।
যে সমস্ত আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়েছে তাদের মধ্যে নুর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন, সাইফুর রহমান এবং উম্মে সুলতানা পপি অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। অন্যদিকে, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিনসহ দশ জন অভিযুক্তকে সম্পূর্ণ খালাস দেওয়া হয়েছে। আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিচার প্রক্রিয়ার একটি নতুন ধাপ সম্পন্ন হলো।
এই মামলার রায়ের পাশাপাশি বিচারিক আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদের ভূমিকা নিয়ে কঠোর পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত মন্তব্য করেছেন যে, ১৬ জন আসামিকে একসঙ্গে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করাটা ছিল এক ধরণের বিচারহীনতাহীন বা মনগড়া সিদ্ধান্ত। বিচারক তার জুডিশিয়াল মাইন্ড সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে হাইকোর্টের রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধরনের ঢালাও রায় প্রদান বিচার বিভাগের জন্য একটি বড় প্রশ্নবিদ্ধ বিষয় বলে বিবেচিত হয়েছে।
বিচারিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে সেই বিচারককে অবিলম্বে ফৌজদারি মামলার বিচারিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইন, বিচার এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি এই বিশেষ নির্দেশনা কার্যকর করার জন্য বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে বিচারিক কার্যক্রমে যেন এ ধরনের ত্রুটি না ঘটে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক এই সিদ্ধান্ত বিচার অঙ্গনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
২০১৯ সালে সোনাগাজীতে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর থেকে পুরো দেশ কেঁপে উঠেছিল। আলিম পরীক্ষার সময় সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে যেভাবে তাকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল, তা মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য ছিল। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আজ এই মামলার রায় একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ দমনে এই রায় দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি শক্ত বার্তা প্রদান করবে বলে আশা করা যায়।




























