‘আমি কোনো পেশাদার চোর নই। ভুল করে চুরি করে ফেলেছি। কাজটি করে আমি অনুতপ্ত।’—এমন কথা লিখে চুরি করা গ্যাস সিলিন্ডার ফেরত দিয়েছে এক চোর। শুধু গ্যাস সিলিন্ডার ফেরত দেওয়াই নয়, চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে সে। একই সঙ্গে সিলিন্ডারটি প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করে একটি চিরকুট রেখে গেছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) রাতে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরফরাদী এলাকায় এ ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে। চোরের রেখে যাওয়া ওই চিরকুট এলাকায় কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার চার দিন আগে চরফরাদী মাদরাসা মোড়ের কামাল মিয়ার চায়ের দোকানে চুরি হয়। চুরির সময় দোকান থেকে একটি বড় গ্যাস সিলিন্ডারসহ কয়েকটি জিনিসপত্র নিয়ে যায় চোর।
চুরির পর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে জানাজানি হলে দোকানদার কামাল মিয়া মালামাল উদ্ধারের আশায় বিভিন্নজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তিনি বিষয়টি স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী যুব সংগঠনের কাছেও জানান এবং এ ঘটনায় বিচারপ্রার্থী হন।
এর কয়েক দিন পরই ঘটে ব্যতিক্রমী ঘটনা। চুরি করা বড় গ্যাস সিলিন্ডারটি একটি মাদরাসায় রেখে যায় ওই চোর। সঙ্গে রেখে যায় নিজের হাতে লেখা একটি চিরকুট।
চিরকুটে চোর লিখেছে, ‘আমি কোনো পেশাদার চোর নই। ভুল করে চুরি করে ফেলেছি। কাজটি করে আমি অনুতপ্ত।’
চুরি করার পর নিজের কাজের জন্য অনুতপ্ত হওয়ার কথা জানিয়ে সে সিলিন্ডারটি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সরাসরি দোকানদার কামাল মিয়ার কাছে সিলিন্ডারটি না দিয়ে মাদরাসায় রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
চিরকুটে সে আরও জানায়, চুরির বিষয়টি নিয়ে এলাকায় বিভিন্ন ধরনের আলোচনা ও দোষারোপ শুরু হয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিল সে।
চিরকুটে ওই ব্যক্তি লিখেছে, ‘এই চুরির বিষয় নিয়ে এলাকার শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন লোককে দোষারোপ করে বিশৃঙ্খলা তৈরির সম্ভাবনা দেখে জিনিসটি ফেরত দিলাম।’
অর্থাৎ চুরির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে যেন ভুল বোঝাবুঝি বা বিরোধ তৈরি না হয়, সেই আশঙ্কা থেকেই সিলিন্ডারটি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে চিরকুটের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।
চোর সিলিন্ডারটি সরাসরি মালিকের কাছে না দিয়ে মাদরাসায় রেখে যাওয়ার কারণও চিরকুটে ব্যাখ্যা করেছে।
সে লিখেছে, ‘জিনিসটি ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর অনেক ভেবে-চিন্তে দেখলাম, প্রকৃত মালিককে কোন উপায়ে ফেরত দেয়া যায়। অন্য কোনো উপায়ান্তর না দেখে মাদরাসায় রেখে গেলাম।’
এর মাধ্যমে সে বোঝাতে চেয়েছে, সিলিন্ডারটি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মালিকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নিরাপদ কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে মাদরাসায় রেখে যাওয়াকেই উপযুক্ত মনে করেছে।
চিরকুটের শেষ অংশে চোর সিলিন্ডারটির প্রকৃত মালিকের পরিচয়ও স্পষ্ট করে দিয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘জিনিসটি ঠাকুরবাড়ির চা দোকানদার কামালের।’
এরপর চিরকুটটি পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সে লিখেছে, ‘দয়া করে কাগজটি পেলে দেখে ছিঁড়ে ফেলবেন। ক্ষমাপ্রার্থী।’
অর্থাৎ চিরকুটে একদিকে নিজের পরিচয় না দিয়ে চুরির কথা স্বীকার করা হয়েছে, অন্যদিকে নিজের কাজের জন্য অনুতাপ ও ক্ষমা প্রার্থনাও করা হয়েছে
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর চরফরাদী এলাকায় চুরির বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণত চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধারের ঘটনা স্থানীয়দের কাছে স্বস্তির হলেও এ ঘটনায় চোর নিজেই চুরি করা মালামাল ফেরত দেওয়ায় বিষয়টি আলাদা কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে চিরকুটে নিজের কাজকে ভুল হিসেবে উল্লেখ করে অনুতপ্ত হওয়ার কথা বলা এবং এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় মালামাল ফেরত দেওয়ার ব্যাখ্যা স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে চুরি করা অন্য মালামালগুলোও ফেরত দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে চোরের পরিচয় বা তার অবস্থান সম্পর্কেও কোনো তথ্য জানা যায়নি।
দোকানদার কামাল মিয়া বলেন, চুরির পর তিনি বিষয়টি স্থানীয়ভাবে জানিয়েছিলেন এবং মালামাল উদ্ধারের আশা করেছিলেন। পরে মাদরাসায় গ্যাস সিলিন্ডার ও চিরকুট পাওয়ার খবর পান।
চুরি যাওয়া গ্যাস সিলিন্ডারটি ফিরে পাওয়ায় তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেন। তবে কে বা কারা দোকানে চুরি করেছিল, সে বিষয়ে তিনি কোনো নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি।
চুরির ঘটনায় মালামাল হারানোর পর কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত অন্তত গ্যাস সিলিন্ডারটি ফিরে পাওয়ায় তার ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে চোরের লেখা চিরকুটটি এখন স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় কৌতূহল তৈরি হলেও চুরির ঘটনায় আইনগতভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।





























