ছিনতাইয়ে নিহত অটোরিকশাচালক আতাউর রহমানের মৃত্যুর খবর যেন এক মুহূর্তে আরও বড় শোকে পরিণত হলো। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় অটোরিকশা ছিনতাইয়ের সময় ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান তিনি। আর ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মারা যান তার মা জহুরা খাতুন। মর্মান্তিক এই ঘটনায় পরিবার ও এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতে উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়নের মির্জানগর গ্রামের একটি সড়ক থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় আতাউরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করছে।
প্রতিদিনের মতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন আতাউর রহমান। রাতে বাড়িতে ফেরার কথা থাকলেও আর ফেরা হয়নি তার। মির্জানগর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের শিমুলতলী সড়কের নির্জন স্থান থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তার মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। স্বজনদের ধারণা, অটোরিকশাটি ছিনতাই করার উদ্দেশ্যেই তাকে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
আতাউর রহমান উপজেলার বারিষাব ইউনিয়নের নরোত্তমপুর গ্রামের আব্দুল কাদিরের ছেলে। পেশায় তিনি ছিলেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক। পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রতিদিনের মতো তার স্বাভাবিকভাবে বাড়ি ফেরার অপেক্ষাই ছিল। কিন্তু সেই অপেক্ষা পরিণত হয় হৃদয়বিদারক খবরে। নিহতের মামাতো ভাই আকরাম হোসেন জানান, আতাউরের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তার ফুফু জহুরা খাতুন প্রচণ্ডভাবে ভেঙে পড়েন। তিনি চিৎকার করে মাটিতে পড়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, জহুরা খাতুন আগে থেকেই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ছেলের মৃত্যুর শোক তার মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে পরিবারের ধারণা।
ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। কাপাসিয়া আড়াল বাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ৯৯৯-এ খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। কাপাসিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ নাছির আহমদ বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি হত্যাকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে তখনও লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জরুরি সেবা ও পুলিশের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি ওয়েবসাইট দেখা যেতে পারে।
ঘটনাটির রহস্য উদঘাটনে মাঠে নেমেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার রকিবুল আফসার জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পাশাপাশি পিবিআইয়ের একাধিক টিম বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। তদন্তকারীরা হত্যার কারণ, অটোরিকশার অবস্থান এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন। তবে আটক ব্যক্তিরাই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত কি না, সে বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (PBI) সরকারি ওয়েবসাইট-এ তদন্ত সংস্থাটির কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।
একজন অটোরিকশাচালকের প্রাণহানি এবং একই সঙ্গে তার মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। স্বজনদের কাছে এটি শুধু একজন পরিবারের সদস্যকে হারানোর ঘটনা নয়; বরং কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি আপনজনকে হারানোর নির্মম বাস্তবতা। আতাউরের জানাজা ও দাফন শুক্রবার বিকেলে সম্পন্ন করার কথা জানান স্বজনরা। অন্যদিকে তদন্তকারীরা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। ছিনতাইয়ে নিহত আতাউর রহমানের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের। একই সঙ্গে নির্জন সড়কে চলাচলকারী অটোরিকশাচালকদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।




























