বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন-বিপিসির কাছে আর মাত্র ১৫ দিনের জ্বালানি তেল কেনার টাকা আছে। অর্থাৎ অক্টোবরে যেকোনো সময় তেল আমদানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তেল আমদানি ঠিক রাখতে বিপিসিকে প্রথমবারের মতো (মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর) ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত হিসাব দিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। বৈঠকে জানানো হয়ছে, তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আপাতত সরকারের নেই। বৈঠকে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি সচিব, বিপিসির চেয়ারম্যানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, এতদিন সরকার এলএনজি এবং বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের ভর্তুকি দিয়েছে। কিন্তু তেল আমদানির জন্য চলতি বছর সরকার এক টাকাও ভর্তুকি দেয়নি। সম্প্রতি বিপিসি এক চিঠি দিয়ে বড় শঙ্কার কথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জানিয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, বিপিসির জমানো সব টাকা নিঃশেষ হতে চলেছে। ব্যাংকে আর মাত্র ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা অবশিষ্ট আছে। ওই টাকা দিয়ে কোনোভাবে সেপ্টেম্বর মাসে তেল আমদানি করা যাবে। এরপর যেকোনো সময় তেল আমদানি বন্ধ হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি কর্মকর্তা এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর এলএনজি, তেল ও কয়লার দাম বাড়তে থাকে। সর্বশেষ চলতি মাসে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অর্থাৎ ব্যান্ড ত্রুড ১০৮ ডলারে উঠে। বৃহস্পতিবার সেই দাম কিছুটা নেমে ১০২ ডলার হয়। এ কারণে বিপিসিকে প্রচুর লোকসান দিতে হচ্ছে।
এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতি লিটার ডিজেলে এখন সরকারকে ৯০ টাকার বেশি লোকসান দিতে হচ্ছে। এ হিসাবে প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৩৫ কোটি টাকা। দেশে বছরে ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল ব্যবহার হয়। এরমধ্যে ডিজেল ৪৫ লাখ টনের বেশি।
এভাবে বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রির কারণে গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসি নিজের তহবিল থেকে লোকসান দিয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এরমধ্যে এপ্রিল মাসে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুন মাসে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে এই লোকসান ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
বিপিসি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ১৯৫ কোটি, মে মাসে ৪ হাজার ১৮২ কোটি এবং আগস্ট মাসে ২ হাজার ৭৪০ কোটি ৬২ লাখ টাকা। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে ২০২৬ সালে তেল আমদানি খরচ অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে তিনগুণের বেশি বিল দিতে হচ্ছে বিপিসিকে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে বিপিসি তেল আমদানির বিল দিয়েছে ৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। মে মাসে দিয়েছে ১৩ হাজার ৪৮৫ কোটি। আর আগস্টে দিয়েছে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা।
এক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা বিপিসিকে সবচেয়ে বড় বিপদে ফেলেছে এনবিআরের শুল্ক। আগে ট্যারিফ ভ্যালুর ওপর শুল্ক নির্ধারণ করা ছিল। তাই প্রতি লিটার তেল আমদানিতে শুল্ক দিতে হতো ১৬ টাকা ৭৬ পয়সা। এখন সেই শুল্ক নেওয়া হচ্ছে ইনভয়েস ভ্যালুর ওপর।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যত বাড়বে এনবিআর শুল্ক তত বেশি পাবে। যেমন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতি লিটার তেল আমদানিতে এনবিআর শুল্ক পেয়েছে ১৮ টাকা ৩৬ পয়সা। যুদ্ধ শুরুর পর মার্চে এই শুল্ক গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি লিটারে ৩৮ টাকা ৬৪ পয়সা। এপ্রিলে ছিল ৩৮ টাকা ৯০ পয়সা এবং আগস্টে ৩২ টাকা ৪৪ পয়সা।
অর্থাৎ বিপিসির প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে খরচ পড়ছে ২০৫ টাকার মতো। এরমধ্যে প্রায় ৪০ টাকায় (এখনকার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী) হচ্ছে এনবিআরের শুল্ক।
বিপিসি অর্থ বিভাগকে জানিয়েছে, বিপিসি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) এবং অন্যান্য প্রকল্পের জন্য চলতি বছরের এ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন করে তেল আমদানির খরচ মিটিয়েছে। এখন বিপিসি’র একাউন্টে জমা আছে মাত্র ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। এছাড়া ইআরএল-২ এর জন্য জমা আছে মাত্র ১ হাজার ৬৭৯ কোটি।
নিয়ম অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে দুই মাসের তেলের দাম বিপিসির অ্যাকাউন্টে থাকতে হয়। সে অনুযায়ী বিপিসির কাছে ২০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত থাকার কথা। কিন্তু এখন তা নেই। সংশ্লিষ্টরা জানান, দুই মাসের টাকা না থাকলে অনেক ব্যাংক এলসি খুলতে সমস্যা করে।
সামনে বিপিসির বড় খরচ আছে। ডিসেম্বরের মধ্যে এলপিজির প্ল্যান্ট স্থাপনে জমি অধিগ্রহণে ৫২৪ কোটি টাকা এবং এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) প্রকল্পে ঋণের কিস্তির ৬৯০ কোটি টাকা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। এছাড়া অন্যান্য প্রকল্পের জন্য আরও ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে।
এমন পরিস্থিতিতে বিপিসি প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে দেওয়া চিঠিতে তেলের দাম বাড়ানো, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শুল্ক প্রত্যাহার এবং লোকসানের ২২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসাবে দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।




























