সিভিল এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে দেশের বিমান চলাচল খাতকে নতুন উচ্চতায় নিতে চায় সরকার। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়েছে। সরকারের ধারণা, আধুনিক বিমান যোগাযোগ শক্তিশালী হলে ব্যবসা, পর্যটন, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে দেশের সুযোগ বাড়বে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেছেন, দেশের উন্নয়নের সঙ্গে বিমান চলাচল খাতের সম্পর্ক এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ নয়, দক্ষ জনবল তৈরি, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার এবং যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি মনে করেন, একটি শক্তিশালী বিমান খাত দেশের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও দ্রুত যুক্ত করতে পারে।
রাজধানীতে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের আয়োজিত এক কর্মশালায় এই পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। কর্মশালার নাম ছিল ‘সিভিল এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যান ওভারভিউ’। সেখানে দেশের বিমান খাতের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা তৈরির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়।
মন্ত্রী জানান, ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চলতি বছরের শেষ দিকে যাত্রীদের জন্য চালুর প্রস্তুতি রয়েছে। টার্মিনালটি চালু হলে যাত্রীদের চাপ কমবে, চেক-ইন ও ইমিগ্রেশন সেবা দ্রুত হবে এবং আন্তর্জাতিক যাত্রায় স্বস্তি বাড়বে। এটি বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের বড় একটি পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিভিল এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরের কাজও এগোচ্ছে। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাড়লে বিদেশি পর্যটক আসার সুযোগ তৈরি হবে। এতে স্থানীয় হোটেল, পরিবহন, ব্যবসা ও পর্যটন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
সরকার একই সঙ্গে দেশের সাতটি অব্যবহৃত বিমানবন্দর আবার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এসব বিমানবন্দর চালু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ হতে পারে। ব্যবসায়ীরা দ্রুত পণ্য ও সেবা পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন, আর জরুরি সময়ে চিকিৎসা, ত্রাণ ও প্রশাসনিক যোগাযোগেও বিমানবন্দরগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কর্মশালায় আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা আইসিএওর বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ এল আমিরি বিভিন্ন দেশের মাস্টারপ্ল্যান তৈরির অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি কার্যকর পরিকল্পনা শুধু ভবন বা রানওয়ে তৈরির বিষয় নয়। এর সঙ্গে নিরাপত্তা, আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সুরক্ষা, প্রযুক্তি, দক্ষ কর্মী এবং যাত্রীসেবার মানও জড়িত।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আগে থেকে সমন্বিত জাতীয় সিভিল এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যান ছিল না। নতুন এই পরিকল্পনা আগামী ২০ থেকে ৩০ বছর বা তারও বেশি সময়ের জন্য দেশের বিমান খাতের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার ঠিক করবে। বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, এয়ার নেভিগেশন সেবা আধুনিক করা, নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলার বিষয়গুলো এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এই পরিকল্পনা তৈরি করতে বেবিচকের সঙ্গে আইসিএও এবং সিভিল এভিয়েশন একাডেমি বাংলাদেশ কাজ করছে। আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে সিভিল এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ শেষ করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এরপর ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে দেশের বিমান চলাচল খাত আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিমান যোগাযোগ শুধু যাত্রী পরিবহনের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, রপ্তানি, পর্যটন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের সঙ্গেও যুক্ত। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত হলে সিভিল এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যান দেশের আকাশপথকে আরও নিরাপদ, দ্রুত ও আন্তর্জাতিক মানের করে তুলতে পারে। এতে বাংলাদেশ আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে।


























