বর্তমানে ওজন কমানো এবং সুস্থ জীবনযাপনের অংশ হিসেবে অনেকেই ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকার (ফাস্টিং) অভ্যাস অনুসরণ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট সময় না খেয়ে থাকলে শরীরে একাধিক বিপাকীয় পরিবর্তন ঘটে, যা কিছু ক্ষেত্রে উপকার বয়ে আনতে পারে। তবে এই অভ্যাস সবার জন্য নিরাপদ নয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগী, গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
২৪ ঘণ্টা না খেলে শরীরে কী ঘটে?
খাবার না খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই শরীর শক্তি উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করে।
- প্রথমে শরীর রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মাত্রা ধরে রাখতে লিভারে জমা থাকা গ্লাইকোজেন ব্যবহার করে।
- গ্লাইকোজেনের মজুত কমে এলে শরীর শক্তির জন্য জমে থাকা চর্বি ভাঙতে শুরু করে।
- এ সময় কিটোন নামে একটি উপাদান তৈরি হয়, যা শরীরের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
- একই সঙ্গে ইনসুলিনের মাত্রা কমে যায় এবং গ্লুকাগনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা সঞ্চিত শক্তি ব্যবহারে সহায়তা করে।
কী ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে?
যারা আগে কখনও দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকেননি, তাদের ক্ষেত্রে কিছু সাময়িক শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
- ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া
- মাথাব্যথা
- মাথা ঘোরা
- ক্লান্তি
- বিরক্তিভাব
- মনোযোগ কমে যাওয়া
- দুর্বলতা অনুভব করা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ সাধারণত সাময়িক এবং শরীর ধীরে ধীরে নতুন অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেয়।
সবার জন্য কি নিরাপদ?
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে সাধারণত রক্তে শর্করা বিপজ্জনক মাত্রায় নেমে যায় না। কারণ লিভার প্রয়োজন অনুযায়ী গ্লুকোজ সরবরাহ করতে থাকে।
তবে নিচের ব্যক্তিদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—
- ডায়াবেটিস রোগী
- ইনসুলিন বা সুগার কমানোর ওষুধ গ্রহণকারী
- গর্ভবতী নারী
- স্তন্যদানকারী মা
- শিশু
- দুর্বল বা বয়স্ক ব্যক্তি
এ ধরনের ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘ সময় উপবাস করা উচিত নয়। এতে হাইপোগ্লাইসেমিয়া, পানিশূন্যতা বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।
গবেষণায় কী বলা হয়েছে?
২০২৩ সালে প্রকাশিত Physiology, Fasting শীর্ষক একটি গবেষণায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে শরীরে উল্লেখযোগ্য বিপাকীয় পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় সম্ভাব্য যেসব উপকারিতার কথা বলা হয়েছে—
- ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
- মেটাবলিক সিনড্রোমের ঝুঁকি কমতে পারে।
- শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
- ক্ষতিকর লিপিডের মাত্রা কমতে পারে।
এ ছাড়া প্রাণীদের ওপর করা কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের খাদ্যাভ্যাস আলঝেইমার ও পারকিনসনের মতো স্নায়বিক রোগের অগ্রগতি ধীর করতে সহায়তা করতে পারে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সম্ভাব্য ঝুঁকিও রয়েছে
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকতে পারে।
- মাথাব্যথা হতে পারে।
- ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
- ক্যাফেইন হঠাৎ বন্ধ করলে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
- দীর্ঘদিন নিয়মিত করলে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়তে পারে।
- অতিরিক্ত সময় ধরে উপবাস করলে পেশি ক্ষয়ের ঝুঁকি থাকতে পারে।
- কিছু ক্ষেত্রে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সও বাড়তে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, কম ওজনের ব্যক্তি, শিশু এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা কিছু মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে, তবে এটি কোনো সবার জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি নয়। স্বাস্থ্যগত অবস্থা, বয়স এবং ব্যবহৃত ওষুধের ওপর এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। তাই নিয়মিত এই ধরনের ফাস্টিং শুরু করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। এতে সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়িয়ে উপকারিতা পাওয়া সহজ হবে।





























