মুন্সিগঞ্জের বালাশুরের নাগরনন্দী ঘোষবাড়ির দুর্গাপূজা এখন শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, পরিবারের সদস্যদের মিলনমেলাও। ২০১৫ সালে পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে সুসংগঠিতভাবে শুরু হওয়া এ আয়োজনের টানে প্রতিবছর একত্র হন দূরে থাকা স্বজনেরা। পুরোনো বাড়ির উঠানে জমে আড্ডা, চলে পূজার প্রস্তুতি, আর নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় হয় পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যের। এই পারিবারিক দুর্গোৎসব দেখতে ঢাকা থেকে মোটরসাইকেলে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ পেরিয়ে মুন্সিগঞ্জের বালাশুরে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতাও হয়ে ওঠে বিশেষ।
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচার, আবেগ, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক সম্মিলিত উৎসব। দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি এ সময় স্বজনদের সঙ্গে দেখা হওয়া, পুরোনো স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হয়। নাগরনন্দী ঘোষবাড়ির দুর্গাপূজায় এই দিকটি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারীর গ্রামের বাড়ির পূজা হিসেবেও পরিচিত এ আয়োজন।
পূজার কয়েকটি দিন বাড়ির পরিবেশ বদলে যায়। সারা বছর কাজ ও জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় থাকা পরিবারের সদস্যরা এক ছাদের নিচে জড়ো হন। বড়দের সঙ্গে ছোটদের পরিচয় হয়, ভাইবোন ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে চলে গল্প-আড্ডা। পূজার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে পরিবারের নতুন প্রজন্মও পুরোনো রীতিনীতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়।

পারিবারিক উদ্যোগে পূজার সূচনা
নাগরনন্দী ঘোষবাড়িতে আগে থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে পূজা-অর্চনার প্রচলন ছিল। তবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুসংগঠিতভাবে দুর্গাপূজা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৫ সালে। পরিবারের ১৪ ভাই, ৭ বোন এবং তাঁদের আত্মীয়স্বজনের অংশগ্রহণে শুরু হয় এই আয়োজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পূজাটি পরিবারের সদস্যদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পূজার অন্যতম উদ্যোক্তা প্রমীত কুমার ঘোষ জানান, পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এখন শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। জীবিকার প্রয়োজনে সবাই ব্যস্ত থাকায় আগের মতো একসঙ্গে বাড়িতে সময় কাটানোর সুযোগ কমে গিয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পর্ক দৃঢ় করার ভাবনা থেকেই দুর্গাপূজা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রমীত কুমার ঘোষের ভাষ্য, ছোট পরিসরে হলেও গ্রামের বাড়িতে একটি পূজা শুরু করার ইচ্ছা ছিল তাঁদের। পরে পরিবারের সদস্যরা আলোচনা করে একমত হন। জ্যাঠাতো-কাকাতো ভাইবোন, পিসি, পিসির ছেলে, জামাইবাবুসহ আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে শুরু হয় আয়োজন। ধীরে ধীরে এই পূজা পরিবারের সদস্যদের একত্র হওয়ার একটি নিয়মিত উপলক্ষে পরিণত হয়।
ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা
পরিবারের সদস্যদের হিসাবে, তাঁরা ঠাকুরদার প্রজন্ম থেকে চতুর্থ প্রজন্মের উত্তরসূরি। তাঁদের বাড়িতে বহু আগে থেকেই পূজা হতো, তবে ২০১৫ সাল থেকে সবাইকে নিয়ে বড় পরিসরে আয়োজন শুরু হয়। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিভিন্ন সময় নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। করোনাকালে পূজার আয়োজন সীমিত করতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণেও উৎসবের পরিসর নিয়ে ভাবতে হয়েছে।
তারপরও পারিবারিক ঐক্য ও পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা থেকে পূজা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। নাগরনন্দী ঘোষবাড়ির এই আয়োজন তাই শুধু দেবী দুর্গার আরাধনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবারের প্রজন্মগুলোর মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ারও একটি উপলক্ষ।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন