ঢাকা ০৯:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রেল ইঞ্জিন সংকটে চট্টগ্রাম, প্রতিদিনই ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয়

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৮:৩৪:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫১৩

ইঞ্জিন সংকটে চট্টগ্রামে প্রতিদিনই বিলম্বে চলছে বিভিন্ন রুটের ট্রেন। | ছবি: সংগৃহীত

রেল ইঞ্জিন সংকটে চট্টগ্রামে যাত্রীসেবা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ৯০টি লোকোমোটিভের মধ্যে ৪৮টিই এখন বিকল হয়ে পড়ে আছে। ফলে মাত্র ৪২টি ইঞ্জিন দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন রুটে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। ইঞ্জিনের ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে নিয়মিত শিডিউল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো ট্রেন এক থেকে দুই ঘণ্টা, আবার কিছু ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত দেরিতে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। নির্ধারিত সময়ে অফিস, ব্যবসা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাজে পৌঁছাতে না পেরে অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন।

রোববার (২৪ আগস্ট) চট্টগ্রামের পাহাড়তলী লোকোমোটিভ কারখানায় গিয়ে রেলের এই সংকটের চিত্র পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ না পাওয়ায় একের পর এক লোকোমোটিভ অচল হয়ে পড়ছে। পাহাড়তলী লোকোমোটিভ কারখানার তত্ত্বাবধায়ক এহতেশাম মোহাম্মদ শামস বলেন, ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় পার্টস আমদানি না থাকায় অনেক লোকোমোটিভ মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সচল ইঞ্জিনের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। এমনকি বর্তমানে চলাচলরত ৪২টি ইঞ্জিনের মধ্যে আরও কয়েকটি যে কোনো সময় বিকল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রেল ইঞ্জিন সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে ট্রেনের সময়সূচিতে। রেল সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে চলাচলকারী প্রায় সব ট্রেনই কোনো না কোনোভাবে বিলম্বের মুখে পড়ছে। শনিবার ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা মেইল চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা ছিল সকাল ৭টায়। কিন্তু ইঞ্জিন সংকটের কারণে সেটি প্রায় চার ঘণ্টা দেরিতে সকাল ১১টায় চট্টগ্রামে পৌঁছে। শুধু ট্রেন দেরি নয়, যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে কোচের সমস্যাও। প্রথম শ্রেণির একটি কোচে ফ্যান নষ্ট থাকায় প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় কষ্ট করতে হয়েছে যাত্রীদের।

সমস্যার আরেকটি দিক হলো ইঞ্জিনের ওপর অতিরিক্ত চাপ। নিয়ম অনুযায়ী একটি লোকোমোটিভ গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নির্দিষ্ট সময় বিশ্রাম দেওয়ার কথা। রেল কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, একটি ইঞ্জিনকে সাধারণত কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা বিশ্রামে রাখার প্রয়োজন হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ না থাকায় বাস্তবে সেই সময় মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় বিশ্রাম না দিয়েই একই ইঞ্জিন আবার অন্য ট্রেন টানতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ছে এবং মাঝপথে ট্রেন বিকল হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। ফলে একটির পর একটি ট্রেনের সময়সূচিতে প্রভাব পড়ছে।

চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঢাকা রুটেও বিলম্বের অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। শনিবার সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ঢাকায় পৌঁছায় নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই ঘণ্টা পর। একই ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ার পরও প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্ব হয়। যাত্রীদের অভিযোগ, নিয়মিত এমন বিলম্ব চলতে থাকলে রেলপথে যাতায়াতের আগ্রহ ও আস্থা দুটিই কমে যেতে পারে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী যাত্রী আফসার উদ্দিন বলেন, ইঞ্জিন সংকট দীর্ঘদিন চলতে থাকলে রেল যোগাযোগে মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

রেলওয়ে কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, এই সংকট রাতারাতি কাটছে না। রেলওয়ের এডিজি (আরএস) ফকির মহিউদ্দিন জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে পুরোপুরি বের হতে আরও প্রায় ছয় মাস সময় লাগতে পারে। তার ভাষ্য, অতীতে প্রয়োজনীয় ক্রয় কার্যক্রম যথাযথভাবে না হওয়া এবং ব্যয় সংকোচনের কারণে ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশের মজুত কমে গেছে। বর্তমানে নতুন লোকোমোটিভ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন রুটে ট্রেন পরিচালনার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন জানিয়েছেন, সমস্যা দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট সবাই একযোগে কাজ করছেন। এখন যাত্রীদের প্রত্যাশা, নতুন ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ সংগ্রহের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন হবে এবং চট্টগ্রামের রেল যোগাযোগ আবার নির্ধারিত সময়ের ছন্দে ফিরবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রেল ইঞ্জিন সংকটে চট্টগ্রাম, প্রতিদিনই ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয়

Update Time : ০৮:৩৪:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

রেল ইঞ্জিন সংকটে চট্টগ্রামে যাত্রীসেবা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ৯০টি লোকোমোটিভের মধ্যে ৪৮টিই এখন বিকল হয়ে পড়ে আছে। ফলে মাত্র ৪২টি ইঞ্জিন দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন রুটে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। ইঞ্জিনের ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে নিয়মিত শিডিউল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো ট্রেন এক থেকে দুই ঘণ্টা, আবার কিছু ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত দেরিতে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। নির্ধারিত সময়ে অফিস, ব্যবসা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাজে পৌঁছাতে না পেরে অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন।

রোববার (২৪ আগস্ট) চট্টগ্রামের পাহাড়তলী লোকোমোটিভ কারখানায় গিয়ে রেলের এই সংকটের চিত্র পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ না পাওয়ায় একের পর এক লোকোমোটিভ অচল হয়ে পড়ছে। পাহাড়তলী লোকোমোটিভ কারখানার তত্ত্বাবধায়ক এহতেশাম মোহাম্মদ শামস বলেন, ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় পার্টস আমদানি না থাকায় অনেক লোকোমোটিভ মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সচল ইঞ্জিনের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। এমনকি বর্তমানে চলাচলরত ৪২টি ইঞ্জিনের মধ্যে আরও কয়েকটি যে কোনো সময় বিকল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন  সন্ধ্যার মধ্যে ঢাকাসহ ১২ জেলায় ঝড়ের আশঙ্কা, ঘণ্টায় ৬০ কিমি বেগে দমকা হাওয়া

রেল ইঞ্জিন সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে ট্রেনের সময়সূচিতে। রেল সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে চলাচলকারী প্রায় সব ট্রেনই কোনো না কোনোভাবে বিলম্বের মুখে পড়ছে। শনিবার ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা মেইল চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা ছিল সকাল ৭টায়। কিন্তু ইঞ্জিন সংকটের কারণে সেটি প্রায় চার ঘণ্টা দেরিতে সকাল ১১টায় চট্টগ্রামে পৌঁছে। শুধু ট্রেন দেরি নয়, যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে কোচের সমস্যাও। প্রথম শ্রেণির একটি কোচে ফ্যান নষ্ট থাকায় প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় কষ্ট করতে হয়েছে যাত্রীদের।

সমস্যার আরেকটি দিক হলো ইঞ্জিনের ওপর অতিরিক্ত চাপ। নিয়ম অনুযায়ী একটি লোকোমোটিভ গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নির্দিষ্ট সময় বিশ্রাম দেওয়ার কথা। রেল কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, একটি ইঞ্জিনকে সাধারণত কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা বিশ্রামে রাখার প্রয়োজন হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ না থাকায় বাস্তবে সেই সময় মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় বিশ্রাম না দিয়েই একই ইঞ্জিন আবার অন্য ট্রেন টানতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ছে এবং মাঝপথে ট্রেন বিকল হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। ফলে একটির পর একটি ট্রেনের সময়সূচিতে প্রভাব পড়ছে।

আরও পড়ুন  রাশিয়ায় কর্মী পাঠানো বাড়াতে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ

চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঢাকা রুটেও বিলম্বের অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। শনিবার সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ঢাকায় পৌঁছায় নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই ঘণ্টা পর। একই ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ার পরও প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্ব হয়। যাত্রীদের অভিযোগ, নিয়মিত এমন বিলম্ব চলতে থাকলে রেলপথে যাতায়াতের আগ্রহ ও আস্থা দুটিই কমে যেতে পারে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী যাত্রী আফসার উদ্দিন বলেন, ইঞ্জিন সংকট দীর্ঘদিন চলতে থাকলে রেল যোগাযোগে মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

আরও পড়ুন  হজ ফ্লাইট কর কমানো: সুখবর, সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিমানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক

রেলওয়ে কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, এই সংকট রাতারাতি কাটছে না। রেলওয়ের এডিজি (আরএস) ফকির মহিউদ্দিন জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে পুরোপুরি বের হতে আরও প্রায় ছয় মাস সময় লাগতে পারে। তার ভাষ্য, অতীতে প্রয়োজনীয় ক্রয় কার্যক্রম যথাযথভাবে না হওয়া এবং ব্যয় সংকোচনের কারণে ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশের মজুত কমে গেছে। বর্তমানে নতুন লোকোমোটিভ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন রুটে ট্রেন পরিচালনার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন জানিয়েছেন, সমস্যা দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট সবাই একযোগে কাজ করছেন। এখন যাত্রীদের প্রত্যাশা, নতুন ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ সংগ্রহের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন হবে এবং চট্টগ্রামের রেল যোগাযোগ আবার নির্ধারিত সময়ের ছন্দে ফিরবে।