ঢাকা ০৯:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১০ মিনিট সময় চেয়ে লাখো রোহিঙ্গার আকুতি

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৮:২৮:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫১৪

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দাবিতে উখিয়ার ক্যাম্পে লাখো রোহিঙ্গার সমাবেশ। | ছবি: সংগৃহীত

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দাবিতে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মঙ্গলবার ব্যতিক্রমী এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘নাইন ইয়ারস গন, থিংক টেন মিনিটস ফর রোহিঙ্গা’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে নবম রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবসে ঘরে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন লাখো রোহিঙ্গা। সকাল থেকে উখিয়ার ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশনের ফুটবল মাঠে জড়ো হন বিভিন্ন বয়সী রোহিঙ্গারা। তাদের একটাই দাবি—নিজেদের জন্মভূমি মিয়ানমারের আরাকানে নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যেতে চান তারা।

নাগরিক সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর) আয়োজিত এ সমাবেশে গণহত্যায় নিহত স্বজনদের স্মরণ করা হয়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি, দীর্ঘদিনের শরণার্থীজীবন, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহির বিষয়েও আলোচনা হয়। সমাবেশে বক্তারা বলেন, ২০১৭ সালের ভয়াবহ সহিংসতার পর প্রায় নয় বছর কেটে গেলেও তাদের জীবনে স্বাভাবিকতা ফেরেনি। নিজের ঘর হারানোর কষ্টের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বজন হারানোর বেদনা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তা।

সমাবেশে রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী মোহাম্মদ রফিক বিশ্বের মানুষের প্রতি আবেগঘন আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নয় বছর ধরে রোহিঙ্গারা অপেক্ষা করছেন, তাই বিশ্বের কাছে মাত্র ১০ মিনিট সময় চান তারা। বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু এই দেশ তাদের নিজস্ব দেশ নয়। নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। তার বক্তব্যে উঠে আসে আরাকানে ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপনের আকুতি। রোহিঙ্গাদের দাবি, তাদের দীর্ঘ সংকটের দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও গুরুত্ব দিয়ে তাকাতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য মোহাম্মদ সৈয়দ উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে, তার জন্য তারা কৃতজ্ঞ। তবে দীর্ঘদিন শরণার্থী হিসেবে বসবাস করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তার মতে, প্রত্যাবাসন শুধু সীমান্ত পার করে মানুষকে মিয়ানমারে পাঠানোর নাম নয়; সেখানে ফিরে যাওয়ার পরও নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা এবং জীবিকার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

সমাবেশে বার্মিজ ভাষায় বক্তব্য দেন ইউসিআর নেতা মাস্টার শোয়েব। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘদিনের ভয় ও অনিশ্চয়তার কথা। রোহিঙ্গারা এমন একটি পরিবেশে নিজ দেশে ফিরতে চান, যেখানে তাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা থাকবে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হবে না। এজন্য মিয়ানমারে স্থায়ী ও কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সমাবেশের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে যখন অংশগ্রহণকারীরা টানা ১০ মিনিট ধরে রোহিঙ্গা ভাষায় বিভিন্ন স্লোগান দেন। ‘শেষ হতা এক্কান—ফিরতে চাই আরকান’ অর্থাৎ ‘আমাদের শেষ কথা একটাই—আরকানে ফিরতে চাই’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে ক্যাম্পের পরিবেশ। এই ১০ মিনিটের প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের দুর্দশা ও ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেন তারা। প্রতি বছর ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস পালনের মধ্য দিয়ে ২০১৭ সালের সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ করা হয় এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি জানানো হয়।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রতিবছরের মতো এবারও রোহিঙ্গাদের এই সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সমাবেশ ঘিরে ক্যাম্প এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এপিবিএনের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। তবে রোহিঙ্গাদের কাছে এই দিনটি শুধু স্মরণের নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। দীর্ঘ নয় বছরের অপেক্ষার পর তাদের প্রত্যাশা—একদিন নিরাপদ পরিবেশে নিজ জন্মভূমিতে ফিরবেন এবং সেখানে অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

১০ মিনিট সময় চেয়ে লাখো রোহিঙ্গার আকুতি

Update Time : ০৮:২৮:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দাবিতে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মঙ্গলবার ব্যতিক্রমী এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘নাইন ইয়ারস গন, থিংক টেন মিনিটস ফর রোহিঙ্গা’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে নবম রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবসে ঘরে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন লাখো রোহিঙ্গা। সকাল থেকে উখিয়ার ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশনের ফুটবল মাঠে জড়ো হন বিভিন্ন বয়সী রোহিঙ্গারা। তাদের একটাই দাবি—নিজেদের জন্মভূমি মিয়ানমারের আরাকানে নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যেতে চান তারা।

নাগরিক সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর) আয়োজিত এ সমাবেশে গণহত্যায় নিহত স্বজনদের স্মরণ করা হয়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি, দীর্ঘদিনের শরণার্থীজীবন, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহির বিষয়েও আলোচনা হয়। সমাবেশে বক্তারা বলেন, ২০১৭ সালের ভয়াবহ সহিংসতার পর প্রায় নয় বছর কেটে গেলেও তাদের জীবনে স্বাভাবিকতা ফেরেনি। নিজের ঘর হারানোর কষ্টের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বজন হারানোর বেদনা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তা।

আরও পড়ুন  টেকনাফে ৩০ কোটি টাকার মাদক উদ্ধার, অস্ত্র জব্দ

সমাবেশে রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী মোহাম্মদ রফিক বিশ্বের মানুষের প্রতি আবেগঘন আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নয় বছর ধরে রোহিঙ্গারা অপেক্ষা করছেন, তাই বিশ্বের কাছে মাত্র ১০ মিনিট সময় চান তারা। বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু এই দেশ তাদের নিজস্ব দেশ নয়। নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। তার বক্তব্যে উঠে আসে আরাকানে ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপনের আকুতি। রোহিঙ্গাদের দাবি, তাদের দীর্ঘ সংকটের দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও গুরুত্ব দিয়ে তাকাতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য মোহাম্মদ সৈয়দ উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে, তার জন্য তারা কৃতজ্ঞ। তবে দীর্ঘদিন শরণার্থী হিসেবে বসবাস করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তার মতে, প্রত্যাবাসন শুধু সীমান্ত পার করে মানুষকে মিয়ানমারে পাঠানোর নাম নয়; সেখানে ফিরে যাওয়ার পরও নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা এবং জীবিকার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

আরও পড়ুন  রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি, ৩ লাখকে ফেরত নিতে সম্মত মিয়ানমার

সমাবেশে বার্মিজ ভাষায় বক্তব্য দেন ইউসিআর নেতা মাস্টার শোয়েব। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘদিনের ভয় ও অনিশ্চয়তার কথা। রোহিঙ্গারা এমন একটি পরিবেশে নিজ দেশে ফিরতে চান, যেখানে তাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা থাকবে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হবে না। এজন্য মিয়ানমারে স্থায়ী ও কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সমাবেশের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে যখন অংশগ্রহণকারীরা টানা ১০ মিনিট ধরে রোহিঙ্গা ভাষায় বিভিন্ন স্লোগান দেন। ‘শেষ হতা এক্কান—ফিরতে চাই আরকান’ অর্থাৎ ‘আমাদের শেষ কথা একটাই—আরকানে ফিরতে চাই’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে ক্যাম্পের পরিবেশ। এই ১০ মিনিটের প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের দুর্দশা ও ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেন তারা। প্রতি বছর ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস পালনের মধ্য দিয়ে ২০১৭ সালের সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ করা হয় এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি জানানো হয়।

আরও পড়ুন  জরুরি উদ্ধার: হামহাম জলপ্রপাতে পিছলে আহত শিক্ষার্থীকে ২ ঘণ্টা পর উদ্ধার

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রতিবছরের মতো এবারও রোহিঙ্গাদের এই সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সমাবেশ ঘিরে ক্যাম্প এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এপিবিএনের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। তবে রোহিঙ্গাদের কাছে এই দিনটি শুধু স্মরণের নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। দীর্ঘ নয় বছরের অপেক্ষার পর তাদের প্রত্যাশা—একদিন নিরাপদ পরিবেশে নিজ জন্মভূমিতে ফিরবেন এবং সেখানে অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবেন।