ঢাকা ১১:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

৯/১১ স্মরণ: কয়েক সেকেন্ডে বদলে গেল জীবন

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৯:৫৯:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৭

ওল্ড ট্রাফোর্ডে চ্যাম্পিয়নস লিগে অভিষেকের অপেক্ষায় সাবাহ এফকে। ছবি: সংগৃহীত

সাবাহ এফকে নামটা হয়তো ইউরোপের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে খুব পরিচিত নয়। কিন্তু আজ ওল্ড ট্রাফোর্ডে নামার আগে এই ক্লাবই লিখে ফেলেছে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অধ্যায়। মাত্র নয় বছর আগে যার অস্তিত্বই ছিল না, সেই আজারবাইজানি ক্লাব এখন চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বে। প্রতিপক্ষ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড—ইউরোপের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব। দুই দলের আর্থিক সামর্থ্য, ইতিহাস ও ইউরোপীয় অভিজ্ঞতার ব্যবধান আকাশ-পাতাল। তবু সাবাহকে আলাদা করে দেখার কারণ একটাই—অল্প সময়ে শূন্য থেকে এত দূর উঠে আসার গল্প। ২০১৭ সালে বাকুতে যাত্রা শুরু করা ক্লাবটি এখন ইউরোপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের নাম লিখিয়েছে।

শুরুটা অবশ্য একেবারেই রূপকথার মতো ছিল না। প্রতিষ্ঠার পর প্রথম মৌসুমে আজারবাইজানের দ্বিতীয় স্তরের লিগে পঞ্চম হয়েছিল সাবাহ। মাঠের ফলাফল দিয়ে সরাসরি প্রিমিয়ার লিগে ওঠার সুযোগও ছিল না। কিন্তু লাইসেন্সিং জটিলতায় শীর্ষ কয়েকটি দল বাদ পড়ায় সুযোগ আসে সাবাহর সামনে। আর সেই সুযোগটাই তারা কাজে লাগায়। পরের কয়েক মৌসুমে সপ্তম, ষষ্ঠ ও পঞ্চম হওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে ক্লাবটি। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে বাণিজ্যিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ। অর্থাৎ, সাবাহর উত্থান কোনো এক রাতের ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক কাজের ফল। সেই পথ পেরিয়েই তারা ইউরোপীয় ফুটবলের দরজায় পৌঁছায়।

সাবাহ এফকের বড় মোড় আসে ২০২২-২৩ মৌসুমে। আজারবাইজান প্রিমিয়ার লিগে রানার্সআপ হয়ে প্রথমবার ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ পায় তারা। এরপর কনফারেন্স লিগ ও ইউরোপা লিগে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ক্লাবটি। গত মৌসুমে অবশ্য আসে সবচেয়ে বড় সাফল্য। ভালদাস দামব্রসকাসের অধীনে সাবাহ একসঙ্গে জেতে আজারবাইজান প্রিমিয়ার লিগ ও দেশটির কাপ। অর্থাৎ ক্লাবের ইতিহাসে প্রথম লিগ শিরোপার সঙ্গে আসে ‘গোল্ডেন ডাবল’। এরপর ইউরোপের বাছাইপর্বে একের পর এক বাধা পেরিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্ব নিশ্চিত করে তারা। ২০২৬ সালে এই অর্জনের মধ্য দিয়ে সাবাহ হয়ে যায় চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বে ওঠা সবচেয়ে কম বয়সী ক্লাব।

এই গল্পে আলাদা করে বলতে হয় কোচ ভালদাস দামব্রসকাসের কথা। পেশাদার ফুটবলার হিসেবে বড় ক্যারিয়ার গড়তে পারেননি লিথুয়ানিয়ান এই কোচ। বরং অল্প বয়সেই খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে কোচিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। কোচিং শেখার জন্য লন্ডনে গিয়ে পড়াশোনা করেছেন, উয়েফার কোচিং ব্যাজ অর্জন করেছেন এবং জীবিকা চালাতে নানা ধরনের কাজও করেছেন। পরে একাধিক দেশে কোচিং করিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সাবাহতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর কাজের ফলও মিলেছে দ্রুত। ২০২৫ সালে ক্লাবটির দায়িত্ব নেওয়া দামব্রসকাস ২০২৫-২৬ মৌসুমে দলকে লিগ ও কাপ—দুই শিরোপাই এনে দেন। এরপর তাঁর দল হ্যাপোয়েল বিয়ার শেভাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের মূল পর্বে জায়গা করে নেয়।

সাবাহ এফকের গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাদের কাজের ধরন। ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর মতো বিপুল অর্থ খরচ করে তারকা খেলোয়াড় কেনার সুযোগ তাদের নেই। তাই নিজেদের শক্তি খুঁজতে হয়েছে অন্য জায়গায়। ডেটা বিশ্লেষণ, প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খুঁজে বের করা এবং উপযুক্ত খেলোয়াড় বাছাই—এসবকেই গুরুত্ব দিয়েছে ক্লাবটি। অনেকটা হলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘মানিবল’-এর দর্শনের মতো। অর্থ কম হলে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হবে—সাবাহর পরিকল্পনাতেও সেই ভাবনাই দেখা যায়। বর্তমান স্কোয়াডে ইউরোপের বড় তারকার ভিড় নেই, কিন্তু দলটি যে জায়গায় পৌঁছেছে, সেটিই তাদের পরিকল্পনার সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

আজ ওল্ড ট্রাফোর্ডে তাই শুধু একটি ম্যাচ খেলতে নামছে না সাবাহ এফকে। এটি তাদের জন্য নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার রাত। একদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দীর্ঘ ইতিহাস, অন্যদিকে মাত্র নয় বছরের পথচলায় সাবাহর চ্যাম্পিয়নস লিগে পৌঁছে যাওয়া—দুই ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি লড়াই। ম্যাচের ফল যা-ই হোক, এই জায়গায় পৌঁছানোতেই সাবাহ ইতিমধ্যে নিজেদের একটি স্বপ্ন পূরণ করেছে। ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করা একটি ছোট ক্লাব কীভাবে পরিকল্পনা, ডেটা, বিনিয়োগ ও ধৈর্যের সমন্বয়ে ইউরোপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পৌঁছাতে পারে, সাবাহ তারই উদাহরণ। আজ রাতের ম্যাচ তাই শুধু ফুটবল নয়; বিন্দু থেকে সিন্ধু গড়ার স্বপ্ন দেখা মানুষদের জন্যও একটি গল্প।

জনপ্রিয় সংবাদ

সুন্দরবনের ‘নানা ভাই’ বাহিনীর প্রধানসহ ১২ বনদস্যুর আত্মসমর্পণ

৯/১১ স্মরণ: কয়েক সেকেন্ডে বদলে গেল জীবন

Update Time : ০৯:৫৯:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাবাহ এফকে নামটা হয়তো ইউরোপের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে খুব পরিচিত নয়। কিন্তু আজ ওল্ড ট্রাফোর্ডে নামার আগে এই ক্লাবই লিখে ফেলেছে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অধ্যায়। মাত্র নয় বছর আগে যার অস্তিত্বই ছিল না, সেই আজারবাইজানি ক্লাব এখন চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বে। প্রতিপক্ষ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড—ইউরোপের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব। দুই দলের আর্থিক সামর্থ্য, ইতিহাস ও ইউরোপীয় অভিজ্ঞতার ব্যবধান আকাশ-পাতাল। তবু সাবাহকে আলাদা করে দেখার কারণ একটাই—অল্প সময়ে শূন্য থেকে এত দূর উঠে আসার গল্প। ২০১৭ সালে বাকুতে যাত্রা শুরু করা ক্লাবটি এখন ইউরোপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের নাম লিখিয়েছে।

শুরুটা অবশ্য একেবারেই রূপকথার মতো ছিল না। প্রতিষ্ঠার পর প্রথম মৌসুমে আজারবাইজানের দ্বিতীয় স্তরের লিগে পঞ্চম হয়েছিল সাবাহ। মাঠের ফলাফল দিয়ে সরাসরি প্রিমিয়ার লিগে ওঠার সুযোগও ছিল না। কিন্তু লাইসেন্সিং জটিলতায় শীর্ষ কয়েকটি দল বাদ পড়ায় সুযোগ আসে সাবাহর সামনে। আর সেই সুযোগটাই তারা কাজে লাগায়। পরের কয়েক মৌসুমে সপ্তম, ষষ্ঠ ও পঞ্চম হওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে ক্লাবটি। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে বাণিজ্যিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ। অর্থাৎ, সাবাহর উত্থান কোনো এক রাতের ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক কাজের ফল। সেই পথ পেরিয়েই তারা ইউরোপীয় ফুটবলের দরজায় পৌঁছায়।

আরও পড়ুন  হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণে লেবাননের দ্বিধা, চাপে ইসরাইল

সাবাহ এফকের বড় মোড় আসে ২০২২-২৩ মৌসুমে। আজারবাইজান প্রিমিয়ার লিগে রানার্সআপ হয়ে প্রথমবার ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ পায় তারা। এরপর কনফারেন্স লিগ ও ইউরোপা লিগে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ক্লাবটি। গত মৌসুমে অবশ্য আসে সবচেয়ে বড় সাফল্য। ভালদাস দামব্রসকাসের অধীনে সাবাহ একসঙ্গে জেতে আজারবাইজান প্রিমিয়ার লিগ ও দেশটির কাপ। অর্থাৎ ক্লাবের ইতিহাসে প্রথম লিগ শিরোপার সঙ্গে আসে ‘গোল্ডেন ডাবল’। এরপর ইউরোপের বাছাইপর্বে একের পর এক বাধা পেরিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্ব নিশ্চিত করে তারা। ২০২৬ সালে এই অর্জনের মধ্য দিয়ে সাবাহ হয়ে যায় চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বে ওঠা সবচেয়ে কম বয়সী ক্লাব।

এই গল্পে আলাদা করে বলতে হয় কোচ ভালদাস দামব্রসকাসের কথা। পেশাদার ফুটবলার হিসেবে বড় ক্যারিয়ার গড়তে পারেননি লিথুয়ানিয়ান এই কোচ। বরং অল্প বয়সেই খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে কোচিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। কোচিং শেখার জন্য লন্ডনে গিয়ে পড়াশোনা করেছেন, উয়েফার কোচিং ব্যাজ অর্জন করেছেন এবং জীবিকা চালাতে নানা ধরনের কাজও করেছেন। পরে একাধিক দেশে কোচিং করিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সাবাহতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর কাজের ফলও মিলেছে দ্রুত। ২০২৫ সালে ক্লাবটির দায়িত্ব নেওয়া দামব্রসকাস ২০২৫-২৬ মৌসুমে দলকে লিগ ও কাপ—দুই শিরোপাই এনে দেন। এরপর তাঁর দল হ্যাপোয়েল বিয়ার শেভাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের মূল পর্বে জায়গা করে নেয়।

আরও পড়ুন  জুলাই কোনো নির্দিষ্ট দলের নয় : রিজভী

সাবাহ এফকের গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাদের কাজের ধরন। ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর মতো বিপুল অর্থ খরচ করে তারকা খেলোয়াড় কেনার সুযোগ তাদের নেই। তাই নিজেদের শক্তি খুঁজতে হয়েছে অন্য জায়গায়। ডেটা বিশ্লেষণ, প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খুঁজে বের করা এবং উপযুক্ত খেলোয়াড় বাছাই—এসবকেই গুরুত্ব দিয়েছে ক্লাবটি। অনেকটা হলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘মানিবল’-এর দর্শনের মতো। অর্থ কম হলে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হবে—সাবাহর পরিকল্পনাতেও সেই ভাবনাই দেখা যায়। বর্তমান স্কোয়াডে ইউরোপের বড় তারকার ভিড় নেই, কিন্তু দলটি যে জায়গায় পৌঁছেছে, সেটিই তাদের পরিকল্পনার সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

আরও পড়ুন  মেসির ৭ রেকর্ড ভাঙার পথে রাফিনিয়া, পারবেন কি?

আজ ওল্ড ট্রাফোর্ডে তাই শুধু একটি ম্যাচ খেলতে নামছে না সাবাহ এফকে। এটি তাদের জন্য নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার রাত। একদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দীর্ঘ ইতিহাস, অন্যদিকে মাত্র নয় বছরের পথচলায় সাবাহর চ্যাম্পিয়নস লিগে পৌঁছে যাওয়া—দুই ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি লড়াই। ম্যাচের ফল যা-ই হোক, এই জায়গায় পৌঁছানোতেই সাবাহ ইতিমধ্যে নিজেদের একটি স্বপ্ন পূরণ করেছে। ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করা একটি ছোট ক্লাব কীভাবে পরিকল্পনা, ডেটা, বিনিয়োগ ও ধৈর্যের সমন্বয়ে ইউরোপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পৌঁছাতে পারে, সাবাহ তারই উদাহরণ। আজ রাতের ম্যাচ তাই শুধু ফুটবল নয়; বিন্দু থেকে সিন্ধু গড়ার স্বপ্ন দেখা মানুষদের জন্যও একটি গল্প।