ঢাকা ১১:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্যামসাংয়ের নজিরের পর বাড়তি বোনাস দাবি, উত্তাল দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজার

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ১১:৩৪:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
  • ৫৩৯

হুন্দাই কারখানার শ্রমিকদের ধর্মঘট। ছবি: সংগৃহীত।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স বড় অঙ্কের বোনাস দিতে সম্মত হওয়ার পর দেশজুড়ে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর মধ্যে নতুন করে আন্দোলনের ঢেউ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পখাতের কর্মীরা এখন কোম্পানির মুনাফার বড় অংশ বোনাস হিসেবে দেওয়ার দাবি জানিয়ে ধর্মঘট ও বিক্ষোভের পথে হাঁটছেন।

সম্প্রতি স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স তাদের একাংশ কর্মীকে ৪ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ঘোষণার পর থেকেই দেশের অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোও একই ধরনের সুবিধার দাবি তুলতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্যামসাংয়ের এই সিদ্ধান্ত অন্য বড় কোম্পানিগুলোর কর্মীদের প্রত্যাশা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

হুন্দাইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আন্দোলনের প্রস্তুতি

দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম গাড়ি নির্মাতা হুন্দাই মোটর-এর অ্যাসেম্বলি লাইনের শ্রমিকরা আগামী সপ্তাহে তিন দিনের আংশিক ধর্মঘটের পরিকল্পনা করেছেন। তাদের দাবি, কোম্পানির সমন্বিত মুনাফার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর্মীদের বোনাস হিসেবে বরাদ্দ করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও রোবট ব্যবহারের ফলে কর্মসংস্থান যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও কোম্পানির কাছ থেকে নিশ্চয়তা চান তারা।

শুধু হুন্দাই নয়, HD Hyundai Heavy Industries, LG Uplus, Hanwha Aerospace এবং HD Hyundai Electric-এর শ্রমিক ইউনিয়নও একই ধরনের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পরিচালন মুনাফার বড় অংশ বোনাস হিসেবে দেওয়া কিংবা বিদ্যমান বোনাস সীমা তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

প্রযুক্তি খাতেও বাড়ছে অসন্তোষ

প্রযুক্তি খাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম Kakao-এর হাজারো কর্মী সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ধর্মঘটে অংশ নেন। তাদের দাবি, কোম্পানির পরিচালন মুনাফার অন্তত ১৫ শতাংশ কর্মীদের বোনাস হিসেবে বরাদ্দ করতে হবে। অন্যদিকে দেশটির শীর্ষ সার্চ ইঞ্জিন Naver-এর শ্রমিক ইউনিয়নও বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ইউনিয়নের সঙ্গে জোট গঠন করে দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

এআই ও রোবট প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ

শ্রমিকদের অন্যতম বড় উদ্বেগ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার। হুন্দাই ও কিয়া মোটর-এর ইউনিয়ন দাবি করেছে, ভবিষ্যতে Atlas হিউম্যানয়েড রোবট কারখানায় আনার আগে অবশ্যই শ্রমিকদের সম্মতি নিতে হবে। তাদের মতে, নতুন প্রযুক্তি চালুর ফলে বিদ্যমান কর্মীদের চাকরি যেন ঝুঁকির মুখে না পড়ে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

অর্থনীতিবিদদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার কঠোর শ্রম আইন কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত করে। ফলে ব্যবসা ভালো চললে কর্মীরা বড় অঙ্কের বোনাস দাবি করছেন, আবার ব্যবসায় মন্দা এলেও চাকরি হারানোর আশঙ্কা তুলনামূলক কম থাকে। এই বাস্তবতাই বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

ব্যবসায়ী মহলের উদ্বেগ

অন্যদিকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, সম্প্রতি শ্রমিকদের অধিকার সম্প্রসারণসংক্রান্ত আইনি পরিবর্তনের ফলে ইউনিয়নের প্রভাব অনেক বেড়ে গেছে। তাদের আশঙ্কা, ঘন ঘন ধর্মঘট ও শ্রমিক আন্দোলনের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং কোম্পানিগুলোর আর্থিক ক্ষতি বাড়বে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হুন্দাই মোটরের ধর্মঘট শুরু হলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৮.৭ বিলিয়ন ওন (প্রায় ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। এদিকে কোম্পানিটি ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের মুনাফা ২১ শতাংশ কমেছে। এর পেছনে বিক্রি হ্রাস, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি এবং চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মুনাফা বণ্টন নিয়ে জাতীয় বিতর্ক

দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফা কীভাবে বণ্টন করা উচিত। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কর্মীদের অবদান বিবেচনায় নিয়ে লাভের ন্যায্য অংশ তাদেরও পাওয়া উচিত। অন্যদিকে অনেক ব্যবসায়িক নেতা মনে করছেন, অতিরিক্ত বোনাস দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, শেয়ারহোল্ডার এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

স্যামসাংয়ের বোনাস ঘোষণা দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে কর্মীরা মুনাফার ন্যায্য অংশ দাবি করছেন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা করছেন। সমঝোতায় পৌঁছানো না গেলে আগামী দিনে দেশটির বিভিন্ন শিল্পখাতে আরও বড় ধরনের শ্রমিক আন্দোলন, ধর্মঘট এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্রম বিরোধ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্যামসাংয়ের নজিরের পর বাড়তি বোনাস দাবি, উত্তাল দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজার

Update Time : ১১:৩৪:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স বড় অঙ্কের বোনাস দিতে সম্মত হওয়ার পর দেশজুড়ে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর মধ্যে নতুন করে আন্দোলনের ঢেউ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পখাতের কর্মীরা এখন কোম্পানির মুনাফার বড় অংশ বোনাস হিসেবে দেওয়ার দাবি জানিয়ে ধর্মঘট ও বিক্ষোভের পথে হাঁটছেন।

সম্প্রতি স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স তাদের একাংশ কর্মীকে ৪ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ঘোষণার পর থেকেই দেশের অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোও একই ধরনের সুবিধার দাবি তুলতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্যামসাংয়ের এই সিদ্ধান্ত অন্য বড় কোম্পানিগুলোর কর্মীদের প্রত্যাশা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

হুন্দাইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আন্দোলনের প্রস্তুতি

দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম গাড়ি নির্মাতা হুন্দাই মোটর-এর অ্যাসেম্বলি লাইনের শ্রমিকরা আগামী সপ্তাহে তিন দিনের আংশিক ধর্মঘটের পরিকল্পনা করেছেন। তাদের দাবি, কোম্পানির সমন্বিত মুনাফার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর্মীদের বোনাস হিসেবে বরাদ্দ করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও রোবট ব্যবহারের ফলে কর্মসংস্থান যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও কোম্পানির কাছ থেকে নিশ্চয়তা চান তারা।

আরও পড়ুন  ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের সমাধান খুব কাছাকাছি : ট্রাম্প

শুধু হুন্দাই নয়, HD Hyundai Heavy Industries, LG Uplus, Hanwha Aerospace এবং HD Hyundai Electric-এর শ্রমিক ইউনিয়নও একই ধরনের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পরিচালন মুনাফার বড় অংশ বোনাস হিসেবে দেওয়া কিংবা বিদ্যমান বোনাস সীমা তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

প্রযুক্তি খাতেও বাড়ছে অসন্তোষ

প্রযুক্তি খাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম Kakao-এর হাজারো কর্মী সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ধর্মঘটে অংশ নেন। তাদের দাবি, কোম্পানির পরিচালন মুনাফার অন্তত ১৫ শতাংশ কর্মীদের বোনাস হিসেবে বরাদ্দ করতে হবে। অন্যদিকে দেশটির শীর্ষ সার্চ ইঞ্জিন Naver-এর শ্রমিক ইউনিয়নও বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ইউনিয়নের সঙ্গে জোট গঠন করে দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

এআই ও রোবট প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ

শ্রমিকদের অন্যতম বড় উদ্বেগ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার। হুন্দাই ও কিয়া মোটর-এর ইউনিয়ন দাবি করেছে, ভবিষ্যতে Atlas হিউম্যানয়েড রোবট কারখানায় আনার আগে অবশ্যই শ্রমিকদের সম্মতি নিতে হবে। তাদের মতে, নতুন প্রযুক্তি চালুর ফলে বিদ্যমান কর্মীদের চাকরি যেন ঝুঁকির মুখে না পড়ে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন  নাইজেরিয়ায় বাজারে বিমান হামলার অভিযোগ, বহু হতাহতের খবর

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

অর্থনীতিবিদদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার কঠোর শ্রম আইন কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত করে। ফলে ব্যবসা ভালো চললে কর্মীরা বড় অঙ্কের বোনাস দাবি করছেন, আবার ব্যবসায় মন্দা এলেও চাকরি হারানোর আশঙ্কা তুলনামূলক কম থাকে। এই বাস্তবতাই বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

ব্যবসায়ী মহলের উদ্বেগ

অন্যদিকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, সম্প্রতি শ্রমিকদের অধিকার সম্প্রসারণসংক্রান্ত আইনি পরিবর্তনের ফলে ইউনিয়নের প্রভাব অনেক বেড়ে গেছে। তাদের আশঙ্কা, ঘন ঘন ধর্মঘট ও শ্রমিক আন্দোলনের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং কোম্পানিগুলোর আর্থিক ক্ষতি বাড়বে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হুন্দাই মোটরের ধর্মঘট শুরু হলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৮.৭ বিলিয়ন ওন (প্রায় ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। এদিকে কোম্পানিটি ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের মুনাফা ২১ শতাংশ কমেছে। এর পেছনে বিক্রি হ্রাস, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি এবং চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন  আল-আকসা মসজিদের ইমাম আটক করল ইসরায়েল

মুনাফা বণ্টন নিয়ে জাতীয় বিতর্ক

দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফা কীভাবে বণ্টন করা উচিত। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কর্মীদের অবদান বিবেচনায় নিয়ে লাভের ন্যায্য অংশ তাদেরও পাওয়া উচিত। অন্যদিকে অনেক ব্যবসায়িক নেতা মনে করছেন, অতিরিক্ত বোনাস দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, শেয়ারহোল্ডার এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

স্যামসাংয়ের বোনাস ঘোষণা দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে কর্মীরা মুনাফার ন্যায্য অংশ দাবি করছেন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা করছেন। সমঝোতায় পৌঁছানো না গেলে আগামী দিনে দেশটির বিভিন্ন শিল্পখাতে আরও বড় ধরনের শ্রমিক আন্দোলন, ধর্মঘট এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্রম বিরোধ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।